Sri Sri Jogeswari Ramkrishna Math
18/03/2021
মাষ্টারকে তিরস্কার ও তাঁহার অহঙ্কার চূর্ণকরণ
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাষ্টারের প্রতি) -- তোমার কি বিবাহ হয়েছে?
মাষ্টার -- আজ্ঞে হাঁ।
শ্রীরামকৃষ্ণ (শিহরিয়া) -- ওরে রামলাল ! যাঃ, বিয়ে করে ফেলেছে !
মাষ্টার ঘোরতর অপরাধীর ন্যায় অবাক্ হইয়া অবনতমস্তকে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। ভাবিতে লাগিলেন, বিয়ে করা কি এত দোষ !
ঠাকুর আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি ছেলে হয়েছে?
মাষ্টারের বুক ঢিপঢিপ করিতেছে। ভয়ে ভয়ে বলিলেন, আজ্ঞে, ছেলে হয়েছে।
ঠাকুর আবার আক্ষেপ করিয়া বলিতেছেন, যাঃ, ছেলে হয়ে গেছে। তিরস্কৃত হইয়া তিনি স্তব্ধ হইয়া রহিলেন।
তাঁহার অহঙ্কার চূর্ণ হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আবার কৃপাদৃষ্টি করিয়া সস্নেহে বলিতে লাগিলেন, দেখ, তোমার লক্ষণ ভাল ছিল, আমি কপাল, চোখ -- এ সব দেখলে বুঝতে পারি। আচ্ছা, তোমার পরিবার কেমন? বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি?
মাষ্টার -- আজ্ঞা ভাল, কিন্তু অজ্ঞান।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) -- আর তুমি জ্ঞানী?
তিনি জ্ঞান কাহাকে বলে, অজ্ঞান কাহাকে বলে, এখনো জানেন না। এখনও পর্যন্ত জানিতেন যে, লেখাপড়া শিখিলে ও বই পড়িতে পারিলে জ্ঞান হয়। এই ভ্রম পরে দূর হইয়াছিল। তখন শুনিলেন যে, ঈশ্বরকে জানার নাম জ্ঞান, ঈশ্বরকে না জানার নাম অজ্ঞান। ঠাকুর বলিলেন, তুমি কি জ্ঞানী! মাষ্টারের অহঙ্কারে আবার বিশেষ আঘাত লাগিল।
শ্রীরামকৃষ্ণ -- আচ্ছা, তোমার সাকারে বিশ্বাস, না নিরাকারে?
মাষ্টার (অবাক হইয়া স্বগত) -- সাকারে বিশ্বাস থাকলে কি নিরাকারে বিশ্বাস হয়? ঈশ্বর নিরাকার, এ বিশ্বাস থাকিলে ঈশ্বর সাকার এ বিশ্বাস কি হইতে পারে? বিরুদ্ধ অবস্থা দুটাই কি সত্য হইতে পারে? সাদা জিনিস -- দুধ, কি আবার কালো হইতে পারে?
মাষ্টার -- আজ্ঞা, নিরাকার -- আমার এইটি ভাল লাগে।
শ্রীরামকৃষ্ণ -- তা বেশ। একটাতে বিশ্বাস থাকলেই হল। নিরাকারে বিশ্বাস, তাতো ভালই। তবে এ বদ্ধি করো না যে, এইটি কেবল সত্য আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে।
মাষ্টার দুইই সত্য এই কথা বারবার শুনিয়া অবাক হইয়া রহিলেন। এ কথা তো তাঁহার পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নাই।
তাঁহার অহঙ্কার তৃতীয়বার চূর্ণ হইতে লাগিল। কিন্তু এখনো সম্পূর্ণ হয় নাই। তাই আবার একটু তর্ক করিতে অগ্রসর হইলেন।
মাষ্টার -- আজ্ঞা, তিনি সাকার, এ বিশ্বাস যেন হল! কিন্তু মাটির প্রতিমা তিনি তো নন --
শ্রীরামকৃষ্ণ -- মাটি কেন গো! চিন্ময়ী প্রতিমা।
মাষ্টার চিন্ময়ী প্রতিমা বুঝিতে পারিলেন না। বলিলেন, আচ্ছা, যারা মাটির প্রতিমা পূজা করে, তাদের তো বুঝিয়ে দেওয়া উচিত যে, মাটির প্রতিমা ঈশ্বর নয়, আর প্রতিমার সম্মুখে ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে পূজা করা উচিত।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) -- তোমাদের কলকাতার লোকের ওই এক! কেবল লেকচার দেওয়া, আর বুঝিয়ে দেওয়া! আপনাকে কে বোঝায় তার ঠিক নাই! তুমি বুঝাবার কে? যাঁর জগৎ, তিনি বুঝাবেন। যিনি এই জগৎ করেছেন, চন্দ্র, সূর্য, মানুষ, জীবজন্তু করেছেন! জীবজন্তুদের খাবার উপায়, পালন করবার জন্য মা বাপ করেছেন, মা বাপের স্নেহ করেছেন তিনিই বুঝাবেন। তিনি এত উপায় করেছেন, আর এ উপায় করবেন না? যদি বুঝাবার দরকার হয় তিনিই বুঝাবেন। তিনি তো অন্তর্যামী। যদি ওই মাটির প্রতিমাপূজা করাতে কিছু ভুল হয়ে থাকে, তিনি কি জানেন না -- তাঁকেই ডাকা হচ্ছে? তিনি ওই পূজাতেই সন্তুষ্ট হন। তোমার ওর জন্য মাথা ব্যথা কেন? তুমি নিজের যাতে জ্ঞান হয়, ভক্তি হয়, তার চেষ্টা কর।
এইবার তাঁহার অহঙ্কার বোধ হয় একেবারে চূর্ণ হইল।
তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ইনি যা বলেছেন তাতো ঠিক! আমার বুঝাতে যাবার কি দরকার! আমি কি ঈশ্বরকে জেনেছি -- না আমার তাঁর উপর ভক্তি হয়েছে! আপনি শুতে স্থান পায় না, শঙ্করাকে ডাকে! জানি না, শুনি না, পরকে বুঝাতে যাওয়া বড়ই লজ্জার কথা ও হীনবুদ্ধির কাজ! একি অঙ্কশাস্ত্র, না ইতিহাস, না সাহিত্য যে পরকে বুঝাব! এ যে ঈশ্বরত্ত্ব। ইনি যা বলেছেন, মনে বেশ লাগছে।
ঠাকুরের সহিত তাঁহার এই প্রথম ও শেষ তর্ক।
শ্রীরামকৃষ্ণ -- তুমি মাটির প্রতিমাপূজা বলছিলে। যদি মাটিরই হয়, সে পূজাতে প্রয়োজন আছে। নানারকম পূজা ঈশ্বরই আয়োজন করেছেন। যার জগৎ তিনিই এ সব করেছেন -- অধিকারী ভেদে। যার যা পেটে সয়, মা সেইরূপ খাবার বন্দোবস্ত করেন।
এক মার পাঁচ ছেলে। বাড়িতে মাছ এসেছে। মা মাছের নানারকম ব্যঞ্জন করেছেন -- যার যা পেটে সয়! কারও জন্য মাছের পোলোয়া, কারও জন্য মাছের অম্বল, মাছের চড়চড়ি, মাছ ভাছা -- এই সব করেছেন। যেটি যার ভাল লাগে। যেটি যার পেটে সয় -- বুঝলে?
মাষ্টার -- আজ্ঞে হাঁ।
শ্রীম কথিত -- শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত
19/02/2021
হৃদয়ের অত্যাচার।
________________
একদিন পরমহংসদেব জ্বরগ্রস্ত হয়ে শুয়ে আছেন, এমন সময় কোন ভক্ত একটি ফুলকপি নিয়ে এল এবং তাঁর কাছে রাখাতে ঠাকুর আহ্লাদে উঠে বসলেন ও কপিটার খুব প্রশংসা করে বললেন “দেখ, তােমরা ঐ ঘরের মধ্যে ইহা লুকাইয়া রাখিয়া আইস।
হৃদয়কে বলিও না যে, আমি ইহা দেখিয়াছি, তাহা হইলে আমায় বড় গালাগালি দিবে!” আজ্ঞা করা মাত্র কপিটাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হল। পরমহংসদেব বলতে লাগলেন, “দেখ, হৃদে আমার যে সেবা করিয়াছে, তাহা আমি কখনই ভুলিব না। হয়তাে মা কালীর ইচ্ছায় সে না থাকিলে আমার দেহ এতদিন থাকিত না। আমি যখন পঞ্চবটীতে ধ্যান করিতাম, হৃদে আমার পশ্চাতে যাইয়া ভয় দেখাইবার জন্য ইট মারিত। কিয়ৎকাল পরে আপনি চলিয়া আসিত। একদিন সে সাহসে ভর করিয়া পঞ্চবটীর মধ্যে প্রবেশ করে। সিদ্ধভূমি পঞ্চবটী, তথায় যাইবামাত্র আমি বলিলাম 'কে ও হৃদে' ?" হৃদে বলিল, “মামা, তুমি একলা বসিয়া কি করিতেছ?” "আমি তাহাকে তথায় বসিয়া ধ্যান করিতে বলিলাম। হৃদে উপবেশন করিবামাত্র ‘মামা গাে! আমার পিঠে কে আগুন ঢালিয়া দিল’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। আমি তাহার পৃষ্ঠে হস্তাৰ্পণ করিয়া ‘ভয় নাই’ বলায়, সে চুপ করিল। সেই মুহূর্ত হইতে কেমন মা কালীর ইচ্ছা, হৃদয়ের ভাবান্তর হইয়া গেল। যেন পাঁচ বােতল মদের নেশা আসিয়া উপস্থিত হইল ও আনন্দে বিভাের হইয়া পড়িল। পরদিন রাত্রে আমি বহির্দেশে গিয়াছি, হৃদে আমার পশ্চাৎ চলিয়া আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে, চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, 'ওরে রামকৃষ্ণ, তুইও যে, আমিও সে, তােতে আমাতে প্রভেদ কি? চল, আমরা আর এখানে থাকিব না।' আমি তাড়াতাড়ি উহার নিকটে আসিয়া বলিলাম, “চুপ চুপ! এখনই সকলে জানিতে পারিবে। আমাদের এখানে
থাকা ভার হইবে। ওরে, আমরা কি হইয়াছি ? চুপ কর। হৃদে কিছুতেই শুনিল না, উত্তরােত্তর চিৎকার বাড়াইল। আমি তখন উপায় না দেখিয়া তাহাকে বলিলাম, এককণা শক্তিধারণ করিতে পারিলি না, তবে আর কি হইবে, জড়বৎ হইয়া যা। অমনি হৃদে ভূমিতে পতিত হইয়া বলিল,
‘মামা, কি সর্বনাশ করিলে! আমি আর অমন করিব না'।" তারপর থেকে হৃদয় বাস্তবিকই জড়বৎ হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন, "হৃদে যেমন আমার সেবা করিয়াছে, মা কালী উহার আশাতীত ফলও দিয়াছেন।
দেশে বিলক্ষণ জমি-জমা করিয়াছে, লােককে টাকা ধার দেয়, এই মন্দিরে
কর্তার ন্যায় হইয়া রহিয়াছে এবং এত লােকে উহার সম্মান করিয়া থাকে।”
এইসব কথা বলার সময় হৃদয় সেখানে এসে উপস্থিত হল। তিনি আসা মাত্র পরমহংসদেব তাকে সম্বােধন করে বললেন, “দেখ, আমি ইহাদের কপি আনিতে বলি নাই, উহারা আপনারা আনিয়াছে, মাইরি বলিতেছি, আমি উহাদের কিছুই বলি নাই।” হৃদয় এই কথা শুনে ঠাকুরকে তিরস্কার করলেন। তার সে মূর্তি মনে হলে এখনও আমাদের হৃৎকম্প উপস্থিত হয়! পরমহংসদেব সরােদনে মা কালীকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, “মা, তুই আমার সংসারবন্ধন কাটিয়া দিলি, পিতা গেল, মাতা গেল, ভাই গেল, স্ত্রী গেল, জাতি গেল —শেষে কি না হৃদয়ের হাতে আমার এই দুর্গতি হইতে লাগিল!” এই কথা বলে তিনি পুনরায় হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন, “ও আমায় বড় ভালবাসে, ভালবাসে বলিয়াই বকে, ছেলেমানুষ, উহার বােধ হয় নাই। উহার কথায় কি রাগ করিতে হয়, মা ?” এই বলতে বলতে সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন।
কিন্তু হৃদয়ের রাগ মিটল না। ঠাকুর ক্রমশ: হৃদয়ের অত্যাচারে নিতান্ত কাতর হয়ে উঠলেন। হৃদয় সেসময় সকলেরই মর্যাদা হানি করতে আরম্ভ করেছিল। ঠাকুরবাড়ির প্রত্যেক কর্মচারী তার জন্য উৎপীড়িত ও মর্মাহত হয়ে থাকত। পরমহংসদেব বার বার নিষেধ করতেন। হৃদয় নিষেধে কান না দিয়ে গর্বের সাথে বলেছিল, “রাসমণির অন্ন ব্যতীত তােমার গতি নাই। তুমি সকলকে ভয় করিবে, আমি কাহাকে গ্রাহ্য করি ? না হয় চলিয়া যাইব।” গরিব ব্রাহ্মণ, জগদম্বার কৃপায় পাঁচজনের পূজনীয় হয়ে সম্মানের সাথে বাস করছিলেন, কিন্তু অদৃষ্টের দোষে তা হৃদয় বুঝতে পারল না। তার বিপদের মূহুর্ত এগিয়ে এল।
কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার বাৎসরিক উৎসবের দিনে সেখানে খুব ধুমধাম হত সেজন্য সেদিন ত্রৈলােক্যবাবু সপরিবারে সেখানে এসেছিলেন। উৎসবের দিন সকালে হৃদয় পূজা করতে যেত। ওখানে ত্রৈলােক্যবাবুর একটা দশ বছরের বিবাহিতা কন্যা তসরের শুদ্ধবস্ত্র পরে দাঁড়িয়ে ছিল। হৃদয় সেই বালিকাটির চরণে পুস্পাঞ্জলি দেয়। এর আগে পরমহংসদেব ঐ প্রকার পূজা করতেন। হৃদয় তা অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনল। কন্যার পায়ে চন্দনের চিহ্ন দেখে তার মা জিজ্ঞাসা করায় হৃদয়ের কাণ্ডকারখানা প্রকাশ হয়ে যায়। ত্রৈলােক্যবাবুর স্ত্রী কন্যার অকল্যাণ হবে ভেবে কাঁদতে লাগলেন। তাই দেখে ত্রৈলােক্যবাবু ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন এবং দারোয়ান দিয়ে একবস্ত্রে হৃদয়কে মন্দির থেকে বহিষ্কার করে দিলেন এবং সেই ক্রোধে
পরমহংসদেবকেও নাকি চলে যাবার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন।
দ্বারবান এই সংবাদ নিয়ে পরমহংসদেবের কাছে উপস্থিত হল। তিনি হেসে বললেন, “তােমার বাবুর আমি কি করিলাম?” এই বলে তিনি সেই অবস্থায় মন্দির থেকে বের হয়ে একমনে চলতে লাগলেন।
পরমহংসদেব যখন বাবুদের বৈঠকখানার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কে জানে কি কারণে ত্রৈলােক্যবাবু জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কোথায় যাইতেছেন?” এই কথা
বলায়, পরমহংসদেব অমনি ফিরলেন এবং তাদের কাছে গিয়ে বসলেন।
ত্রৈলােক্যবাবু, হৃদয়ের সম্বন্ধে নানা কথা বললেন এবং কন্যাটির অকল্যাণের
আশঙ্কায় ভীত হয়ে হৃদয়কে মন্দির ত্যাগ করতে বলেন।
ঠাকুর তাঁকে অভয় দিয়ে পুনরায় নিজ ঘরে ফিরে এলেন।
হৃদয় যদু মল্লিকের উদ্যানে বাস করতে লাগলেন। রামকৃষ্ণদেব দুই বেলা তাঁর নিজের অংশ থেকে অন্নব্যঞ্জন ও মিষ্টান্নাদি পাঠিয়ে দিতেন এবং নিজে তাকে দেখে আসতেন। হৃদয় এই সময়ে পরমহংসদেবকে
মন্দির থেকে চলে আসবার জন্য অনুরােধ করে ও নানারকম যুক্তি দিয়ে বলে যে ,কোন স্থানে গিয়ে একটা কালীমূর্তি স্থাপন করে উভয়ে সুখে বাস করবেন। পরমহংসদেব এই কথা শুনে বলেছিলেন, “তুই কি আমায় লইয়া দ্বারে দ্বারে ফিরি করিয়া বেড়াইবি ?”.......
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনবৃত্তান্ত,লেখক রামচন্দ্র দত্ত- থেকে সংগৃহীত।
প্রণাম নিও ঠাকুর।
19/02/2021
দর্পহারী নারায়ণ -----------
আগেই বলা হয়েছে যে ঈশ্বর ভক্তের সকল অপরাধ ক্ষমা করেন কিন্তু অহংকার সহ্য করেন না। ঠাকুর একদিন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের বিজ্ঞান চেতনার দর্পচূর্ণ করেছিলেন। ডাক্তার সরকার বিজ্ঞানের বাহিরে কিছু থাকা সম্ভব নয় বলে মাঝে মাঝে মত প্রকাশ করতেন। একদিন ঠাকুর যুবক ভক্তদের " কে জানে মা কালী কেমন " গানটি সমবেত কন্ঠে গাইতে বলেন। গাইতে গাইতে অল্পক্ষণের মধ্যেই অনেকের ভাবাবেশ দেখা দিল।
লাটু দাঁড়িয়ে পড়ে সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন, নিরঞ্জন তাকে সামলাতে গিয়ে সমাধিস্থ, পিছনের ঘরে বালক মনীন্দ্র সমাধিস্থ। ঠাকুর অন্তর্যামী - দেখতে পাচ্ছেন ডাঃ সরকারের মনের অবিশ্বাস, তাই তাঁকে বললেন - " তুমি তো একজন বড় ডাক্তার। দেখ দেখি ওদের হঠাৎ এমন হলো কেন?" ডাক্তার সরকার প্রথমে হাত, পা, পরে যন্ত্রযোগে হৃৎপিণ্ড, সর্বশেষে সকলের চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে পরীক্ষা করে ঠাকুরকে বললেন - " বিজ্ঞান শাস্ত্র মতে এরা সকলেই মৃত।" সমাধিস্থ ভক্তেরা কিছু পরে ঠাকুরকে প্রনাম করতে এলে ডাঃ সরকার বিস্মিত ভাবে বললেন , " দেখছি এসবই তোমার খেলা। আজ আমি তোমার কাছে পরাজিত। আমার বিদ্যাভিমান, এমনকি সকল অভিমানই আজ চূর্ণ হয়ে গেল। তুমি যদি বলো, তোমার দর্শনে এত লোক এসেছে সবার জুতো মালা করে গলায় পর়ে আমি স্বচ্ছন্দে রাস্তায় ঘুরে আসতে রাজি।" শুনে ঠাকুর স্মিত হাস্যে বললেন - " তুমি মহৎ ব্যক্তি, তোমার কথাই কাজের সমান।"
--------------------------------------------------------------------
অনুশোচনার অশ্রুতেই ঈশ্বর লাভ হয় ------
একদিন ভুবনেশ্বরের মঠে পন্ডিত ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ অত্যন্ত আক্ষেপ নিয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে বলছিলেন, " মহারাজ ঠাকুরকে দেখার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু অদৃষ্টের এমন পরিহাস যে দর্শন করার মানসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দক্ষিণেশ্বরে যাবার জন্য আলমবাজার পর্যন্ত গিয়ে মনের মধ্যে নানা ভাব ওঠাতে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি, ওখান থেকেই ফিরে এলাম। " এই কথা বলে তিনি অশ্রু বিসর্জন করছেন, আর খালি বলছেন , " আমি হতভাগা "। এতে মহারাজ বলছেন, " আপনি আলমবাজার পর্যন্ত গেলেন তো , ওতেই দর্শন হয়েছে।" ক্ষীরোদ প্রসাদ নয় মস্তকে অশ্রু বিসর্জন করতে করতে বলছেন, " না মহারাজ আমি হতভাগা, আমার দর্শন হয়নি।" মহারাজ গুরুগম্ভীর স্বরে বলছেন - " আমি বলছি আপনার দর্শন হয়েছে।" কন্ঠস্বরে চমকে উঠে তাকিয়ে দেখলেন , মহারাজের স্থান বসে আছেন স্বয়ং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব।
( হোমাগ্নি - ২০১২-২০১৩)
15/02/2021
রামতারক ছিলেন রামকৃষ্ণদেবের খুড়তুতো ভাই, অর্থাৎ খুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাইয়ের ছেলে। চাকরির উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৫৮ সালে কলকাতায় আসেন। ঠাকুরের বয়স তখন ২২ বছর। রামতারক ঠাকুরের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড় ছিলেন। ঠাকুর তাঁকে হলধারী বলে সম্বোধন করতেন। মথুরবাবু রামকৃষ্ণের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে হলধারীর চাকরি পেতে অসুবিধা হয় না।
হলধারী ছিলেন বুদ্ধিমান, সুপণ্ডিত এবং শাস্ত্রজ্ঞ। তাঁকে কালী মন্দিরের পূজার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় ও হৃদয়কে রাধা কৃষ্ণের মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়। এইখানেই গন্ডগোলের সূত্রপাত হয়।
হলধারী ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। তথাপি শক্তি (কালী) পূজাতে তাঁর আপত্তি ছিল না। কিন্তু নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে তিনি মন্দিরের পাচকদের রান্না করা খাবার খেতে অস্বীকার করেন (তাছাড়া রানীমা নীচু গোত্রের হওয়াতে তাঁর একটু দ্বিধা তো ছিলই)। যাহোক মথুরবাবু সমস্ত আয়োজন করে দিয়েছিলেন যাতে তিনি নিজেই রান্না করে খেতে পারেন। মথুরবাবু অবশ্য তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে বলেছিলেন যে রামকৃষ্ণদেব হৃদয়েরা মন্দিরের প্রসাদই পেয়ে (খেয়ে) থাকেন। প্রত্যুত্তরে হলধারী বিনয়ের সাথে বলেন আমার জ্যাটতুতো ভাই আধ্যাত্মিকতার উঁচু শিখরে পৌঁছে গিয়েছে, সে অনেক কিছু করতে পারে, আমি সেখানে এখনও যেতে পারিনি তাই আমি আমাদের প্রথা অনুযায়ী চলাই শ্রেয় মনে করি।
হলধারীর কথাবার্তায় মধুরতার অভাব প্রকাশ পেত। জটিল হলেও তাঁর প্রগাঢ় আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ছিল। কিন্তু তাঁর জ্ঞান বেশি দূর এগুতে পারেনি কারণ তার মূলে ছিল জাতের (ব্রাহ্মণত্ব) ও পাণ্ডিত্যের গরিমা। এই সেবকই সে সময় ঠাকুরের ভক্তদের অন্যতম ছিলেন। রামকৃষ্ণদেব হলধারীর স্বভাবের সাথে পরিচিত ছিলেন তবুও তিনি হলধারীর সাথে আন্তরিকতার সাথে ব্যবহার করতেন।
প্রথানুযায়ী বড় বড় উৎসবের সময় মা কালীকে পাঁঠা বলি দিয়ে ভোগ দেওয়া হত। এই ব্যাপারে হলধারী একটু ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি এই নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারতেন না। তিনি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত, বিষ্ণুর ভক্তেরা অহিংসুক ও নিরামিষাশী হন। মায়ের রুধির তৃষ্ণা এবং ভয়ংকর রূপ হলধারীর কাছে বিরক্তিকর ছিল। মা কালী জন্ম মৃত্যুর বিধান দেওয়ার অধিকারিণী। হলধারী ভক্তিপূর্ণ ভাবে পূজো করতেন না। মা কালী এটা লক্ষ্য করে একদিন তাঁর ধ্বংসাত্মক রূপ ধরে হলধারীকে দেখা দিলেন। তিনি হলধারীকে তিরস্কার করে তক্ষুনি মন্দির থেকে চিরকালের জন্য দূর হয়ে যেতে বল্লেন। আরো বল্লেন যে হলধারীর অনাদরের পূজোতে তিনি অপ্রসন্ন। এজন্য তাঁর পুত্রের প্রাণ চলে যেতে পারে। এ ঘটনার কয়েকদিন পর হলধারী তাঁর সন্তানের মৃত্যুর খবর পেলেন।
এই ঘটনাটি তিনি অকপটে ঠাকুরের কাছে ব্যক্ত করেন। তারপর স্থির হয় হলধারী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে পূজো করবেন আর হৃদয় আগের মতো মা কালীর পূজো করবেন।
তৎকালীন ভারতের বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই পরকীয়া-প্রেম সাধনার পথে অগ্রসর হতেন। হলধারীও রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের পূজোর কাজে বহাল হওয়ার পরে গোপনে ওই সাধনপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু গোপনতা বজায় থাকে না, লোক জানাজানি হয়ে যায়। আবার কেউ কিছু বলতেও পারে না কারণ হলধারী ছিলেন বাক্-সিদ্ধ, কাউকে কিছু বললে (অভিশাপ) সেটা ফলে যেত। হলধারীর গোপন কথা ঠাকুরের কর্ণগত হয়। তিনি এও জানতে পারলেন যে হলধারীকে লোকে নিন্দা করছে। উপায়ন্তর না পেয়ে ঠাকুর তাঁকে সব কথা খুলে বলেন। হলধারী উল্টো বুঝে রাগান্বিত হয়ে বলেন, "তুই আমার থেকে ছোট হয়ে আমাকে অশ্রদ্ধা করলি? তোর মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে!"
এই ঘটনার কিছুদিন পরে একদিন রাত্রিতে ঠাকুরের মুখ দিয়ে সত্যি সত্যিই রক্ত বের হতে লাগল। সিমপাতার রসের মতো রক্তের মিসকালো রং - এত গাঢ় ছিল যে, কিছুটা বাইরে পড়ল কিছুটা মুখের ভিতর জমে সামনের দাঁতের প্রান্ত থেকে বটের ঝুড়ির মতো ঝুলতে লাগল। এ খবর পেয়ে সকলে ছুটে এল। হলধারীও ঐ সংবাদ পেয়ে ছুটে এল। ঠাকুর তাঁকে বললেন, 'দাদা, শাপ দিয়ে তুমি আমার এ কি অবস্থা করলে, দেখ দেখি!' ঠাকুরের অবস্থা দেখে হলধারীও কাঁদতে লাগল।
কালীবাড়িতে সেদিন একজন বয়স্ক ও বিজ্ঞ সাধু ছিলেন। গোলমাল শুনে তিনিও দেখতে গেলেন, তিনি রক্তের রং পরীক্ষা করে আশ্বাস দেন যে ভয়ের কোন কারণ নেই , রক্ত বের হয়ে খুব ভাল হয়েছে। তিনি বলেন যে ঠাকুর যোগসাধনা করতেন। হঠযোগের চরমে জড়সমাধি হয়, ঠাকুরেরও তাই হয়েছিল। সুষুম্নাদ্বার (রক্তবাহী শিরা- তন্ত্রশাস্ত্রে যে তিনটি পথে প্রাণবায়ু প্রবাহিত যথা ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না) খুলে গিয়ে রক্ত মাথায় ওঠার কথা কিন্তু মাথায় না উঠে রক্ত মুখের ভিতরে তালু বা টাকরা অঞ্চলে একটা পথ তৈরি করে বেরিয়ে গেল, এতেই ভাল হল কারণ, নির্বিকল্প সমাধিতে চলে গেলে জ্ঞান ফিরে আসে না। সাধুটি বলেছিলেন যে ঠাকুরের শরীরটা দিয়ে ইচ্ছাময়ীর বিশেষ কোন কাজ আছে; তাই তিনি ঠাকুরকে এভাবে রক্ষা করলেন।
ঠাকুরের সঙ্গে হলধারীর সম্বন্ধ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। হলধারী প্রায় সাত বছর শ্রীশ্রীঠাকুরের সান্নিধ্যে ছিলেন। তথাপি তিনি ঠাকুরকে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারেন নি। হলধারী ছিলেন নিষ্ঠাবান তাই তিনি ঠাকুরের পৈতা ফেলে দেওয়া বা উলঙ্গ হয়ে থাকা পছন্দ করতেন না। হৃদয়কে জিজ্ঞাসা করতেন ব্রাহ্মণ হয়ে ছোট (রামকৃষ্ণদেব) কি করে পৈতা খুলে ফেলে..... ও এমন কি আধ্যাত্মিক উচ্চাবস্থায় বিরাজ করে যে ওর যা ইচ্ছে তাই করতে পারে! মাঝে মাঝে তাঁর মনে হতাে ঠাকুরের মাথার দোষ হয়েছে।
পূজার সময় ঠাকুরের চোখে বহমান প্রেমাশ্রু, ভগবৎ নাম শুনলে অপূর্ব উল্লাস ও ভগবান দর্শনের জন্য বিশুদ্ধ ব্যাকুলতা দেখে হলধারী ভাবতেন, রামকৃষ্ণের ঈশ্বর প্রদত্ত আবেশ না হয়ে থাকলে ওই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় না। হলধারী কিছুতেই ঠাকুরের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করতে পারতেন না। হলধারীর গীতা রামায়ণাদি শাস্ত্র বিচার করার সময় তাঁর দাম্ভিকতার চরম অভিমানের প্রকাশ পেত। ঠাকুর তাঁকে বলতেন তোমার শাস্ত্রে যা লেখা আছে তার উপলব্ধি আমার আছে, সে শুনেই বলত যে তুই গণ্ডমূর্খ, তুই আবার এসব কথা কি করে বুঝবি।
হলধারী তাঁর শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর থেকে মা কালীকে তমোগুণময়ী বলে মনে করতেন। একদিন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেন যে তামসীকে পূজো করলে কি আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়? তুমি কেন তমোগুণময়ীকে পূজো কর? ঠাকুর ইষ্টনিন্দা শুনে মনে খুব ব্যাথা পেলেন। তারপর কালীমন্দিরে গিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মা কালীকে জিজ্ঞাসা করলেন, "মা, হলধারী শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত - সে কেন তোকে তমোগুণময়ী বলে- তুই কি সত্যি সত্যিই তাই? মা কালীর কাছে সঠিক উত্তর জেনে ঠাকুর আনন্দে হলধারীর কাছে ছুটে গিয়ে তাঁর কাঁধে চেপে বসে উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, "তুই মাকে তামসী বলিস? মা কি তামসী? মা যে সব - ত্রিগুণময়ী, আবার শুদ্ধসত্ত্বগুণময়ী!" ঠাকুরের তখন ভাবাবিষ্ঠ, তাঁর কথায় ও স্পর্শে হলধারীর অন্তরের দৃষ্টির উন্মোচন হল! তিনি তখন পূজার আসনে উপবিষ্ট ছিলেন - কনিষ্ঠের ভিতর সাক্ষাৎ মা কালীর আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করে ফুল চন্দন দিয়ে ঠাকুরের পায়ে ভক্তিভরে অঞ্জলি প্রদান করলেন! পরে হৃদয় তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, "মামা, এই তুমি বল রামকৃষ্ণকে ভূতে পেয়েছে, তবে আবার তাঁকে পূজা করলে যে?" হলধারী বলিলেন, "কি জানি, হৃদু, কালীঘর হতে ফিরে এসে সে আমাকে কি যে একরকম করিয়া দিল, আমি সব ভুলে তার ভিতর সাক্ষাৎ ঈশ্বরপ্রকাশ দেখিতে পেলাম! কালীমন্দিরে যখনই আমি রামকৃষ্ণের কাছে যাই, তখনই আমাকে ওরকম করে দেয়! এ এক চমৎকার ব্যাপার - কিছু বুঝতে পারি না!"
কিন্তু হলধারী ঠাকুরের ভিতর বার বার ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতে পেলেও শাস্ত্রবিচার করতে বসলেই তাঁর পাণ্ডিত্যাভিমান জেগে উঠতো। ঠাকুরবাড়িতে প্রসাদ পেতে কাঙালীদেরকে নারায়ণজ্ঞান করে ঠাকুর তাদের ভোজনাবশেষ গ্রহণ করেছিলেন - হলধারী তাতে বিরক্ত হয়ে তাঁকে বলেন , "তোর ছেলেমেয়ের কেমন করিয়া বিয়ে হয়, তা দেখব!" জ্ঞানাভিমানী হলধারীর মুখে ওই রকম কথা শুনে ঠাকুর উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, "তবে রে শালা, শাস্ত্রব্যাখ্যা করবার সময় তুই না বলিস, জগৎ মিথ্যা ও সর্বভূতে ব্রহ্মদৃষ্টি করিতে হয়? তুই বুঝি ভাবিস, আমি তোর মতো জগৎ মিথ্যা বলব, অথচ ছেলেমেয়ের বাপ হব! ধিক্ তোর শাস্ত্রজ্ঞানে!"......
সংগৃহীত।
প্রণাম নিও ঠাকুর।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Website
Address
Liluah
Howrah