Vedic Knowledge Hub
11/03/2024
॥ সাধনা ঔষধালয় - একটি অনন্য ব্যতিক্রমী বাঙালি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ॥
#সাধনাঔষধালয়, ঢাকা। আজকের দিনে বড় বেমানান এই প্রতিষ্ঠান।
দোকান বন্ধ। অথচ কর্মচারীদের এখনও বসিয়ে বসিয়ে মাহিনা দেয়। সারা ভারতবর্ষে তথা বর্তমান বাংলাদেশে এটি একটি বিরল ঘটনা।
আজ ফিরে দেখা সেই ইতিহাস।
১৯০৫ সাল বঙ্গভঙ্গ।
চারিদিকে তখন স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার।
বিদেশি পণ্য বয়কট কর।
দেশীয় শিল্প গড়ে তুলতে নেমে পড়লেন একদল উদ্যোগী বাঙালি যুবক। নেতৃত্বে বিশ্ববিখ্যাত বাঙালী বৈজ্ঞানিক আচার্য #প্রফুল্লচন্দ্ররায়
একের পর এক দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল।
এইচ বোসের কলের গান, কেশতেল, দেলখোশ সুবাস, সি কে সেনের জবাকুসুম, বেঙ্গল পটারি,বেঙ্গল গ্লাস ফ্যাক্টরি, পি এম বাকচির কালি, সুগন্ধি, মোহিনী মিলের কাপড়ের কারখানা,সেন রেলের সাইকেল কারখানা এবং স্বয়ং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যাল আরো কত শিল্প।
আর এই পথ ধরে এক বাঙালি যুবক গড়ে তুললেন সাধনা ঔষধালয়।
নাম তার যোগেশচন্দ্র ঘোষ।
সেই আমলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের এম এ।
ভাগলপুরে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে মাস্টারমশাই আচার্য পি সি রায়ের অনুপ্রেরণায় গড়ে তুললেন আয়ুর্বেদ ঔষধের কারখানা।
তার নাম হল সাধনা ঔষধালয় ঢাকা।
অচিরেই এই প্রতিষ্ঠানের নাম সারাভারতে ছড়িয়ে পড়ল।
সুভাসচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই প্রতিষ্ঠানের ওষুধ ব্যবহার করতেন।
১৯২৪ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র নিজে এলেন ঢাকায়, পরিদর্শণ করে গেলেন সাধনা ঔষধালয়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জ্বর হলেই এই প্রতিষ্ঠানের ওষুধ খেতেন।
সেইসময় প্রায় চারশোর বেশি শাখা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
পণ্য রফতানি হত আমেরিকা, চীন, ইরাক, ইরান, আফ্রিকার দেশে।
এবার এল সেই দিন! ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।
যোগেশচন্দ্র পরিবারের সকলকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন।
শত বলা সত্বেও বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেন না।
বললেন, মরলে এখানেই মরবো।
তবু এদেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না।
ফলে যা হবার হল।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস।
সশস্ত্র খান সেনেরা কারখানায় এলো।
গুলি করে খুন করল যোগেশচন্দ্র ঘোষকে।🙂
তবু ফ্যাক্টরি বন্ধ হল না।
কারণ সাধনা ঔষধালয়ের প্রডাক্টের তখনও প্রবল চাহিদা।
একশো তিরিশটা দোকান চলছে ভারতে।
কলকাতায় তিরিশটা শাখা।
দাক্ষারিস্ট,চ্যবনপ্রাশ, সারিবাদি সালসা, জ্বরের ওষুধ,বিউটি ক্রিম আরো কত প্রডাক্টের তখনও হেভি ডিমান্ড।
৮০ সাল পর্যন্ত কোম্পানি চার কোটি টাকা লাভ করেছে।
তারপর ২০০৮ থেকে ২০১২ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায় আধুনিকীকরণের অভাবে।
অনেক দোকান তবু খোলা ছিল।
কিন্তু যোগেশচন্দ্রের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের বেতন দেওয়া বন্ধ হল না।
তাদের চলবে কিভাবে?
সারা ভারতবর্ষে এই ঘটনা এক বিরল দৃষ্টান্ত।
যেখানে মালিকরা শ্রমিক কর্মচারীদের পি এফ, গ্র্যাচুয়াটির টাকা মেরে দেয় সেখানে যোগেশচন্দ্ররা ব্যতিক্রম তো বটেই।
সব মালিক যদি এরকম হত!
এই কোম্পানির জীবিত একমাত্র বংশধর হলেন শীলা ম্যাডাম।
তিনিই উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমানে কোম্পানির মালিক।
তিনি বিবাহ করেননি।
তিনি আধ্যাত্মিকতা নিয়ে থাকেন।
এই কোম্পানির বর্তমানে কিছু দোকান এখনও খোলা আছে।
অনেক ওষুধই নেই।
বিক্রি একরকম নেই।
কর্মচারীরা বলেন আজকের দিনে ৩৪ টাকা কিংবা ৫৫ টাকায় কোন ওষুধ পাওয়া যায়?
দাম বাড়ানো দরকার।
কিন্তু শীলা ম্যাডাম অনড়।
তিনি বলেন অল্প লাভ রেখে গরীব মানুষের পাশে একটু দাঁড়ালে ক্ষতি কি?
অত টাকা করে কী লাভ?
যতদিন পারে চলুক।
তবু টিমটিম করে জ্বলছে শতবর্ষের বেশি প্রাচীন সাধনা ঔষধালয়।
এখনও কলকাতা ও রাজ্যের বুকে দু'একটা রঙচটা সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে যার একটি আজও বিদ্যমান।
" সাধনা ঔষধালয়, ঢাকা" একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান।
কালের নিয়মে একদিন হারিয়ে যাবে এই প্রতিষ্ঠান।
শুধু জেগে থাকবে এক দেশপ্রেমিক বাঙালির স্বপ্ন,
"সাধনা ঔষধালয়।"
শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিবা জানাতে পারি আপনাকে শ্রদ্ধেয় #যোগেশচন্দ্রঘোষ মহাশয়।
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকার নিবন্ধ।
NG Banerjee এর ওয়াল থেকে
13/11/2023
শঙ্কা : বহু জন্মের পর উত্তম কর্মের ফল-স্বরূপ মনুষ্য জন্ম প্রাপ্তি হয়। বর্তমানে পুণ্যকর্ম কম অপিতু পাপকর্ম বেশি হচ্ছে, এই হিসাব অনুযায়ী মনুষ্যের সংখ্যা কম হওয়ার ছিলো কিন্তু দেখা যাচ্ছে মনুষ্যের সংখ্যা কমার বদলে বেড়েই চলেছে, এর কারণ কি?
সমাধান : প্রশ্ন হলো মনুষ্যের সংখ্যা কেন বৃদ্ধি হচ্ছে, যদ্যপি পাপ অধিক হচ্ছে। উত্তর বুঝার জন্য–
▪️আচ্ছা বলুন তো মনুষ্যের সংখ্যা অধিক নাকি অন্য জীব-জন্তু, পোকামাকড় আদি? উত্তর নিশ্চয় জীব-জন্তু, পোকামাকড় আদি হবে। এর দ্বারা বুঝাই যাচ্ছে পুণ্যকর্ম কম হচ্ছে তাই মনুষ্যের সংখ্যা কম অপরদিকে পাপ বেশি হচ্ছে তাই সংসারে জীব-জন্তু পোকামাকড় আদি বেশি। এ হলো স্থুল সহজ সরল উত্তর।
▪️এখন বলুন যে, বিগত ৬০ বছরে মনুষ্যের সংখ্যা যা বৃদ্ধি হয়েছে তা সামান্য গরিব ঘরে হয়েছে নাকি উচ্চ পদস্থ, উত্তম ঘরে বৃদ্ধি হয়েছে? এই বৃদ্ধি তো সামান্য পরিবারে হয়েছে। তারমানে - পশু-পাখি, পোকামাকড়ের শরীর থেকে জীবাত্মা ফিরে আসতেছে। এইজন্য সামান্য পরিবারেই মনুষ্যের বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
সংখ্যা উত্তম/পুণ্য কর্মের জন্য বৃদ্ধি হচ্ছেনা। পাপের দন্ড ভোগ করার পর পুনঃ মনুষ্য শরীর প্রাপ্ত হচ্ছে। এইজন্যই সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে।
▪️এইসময় যারা পাপ করতেছে, তারা মৃত্যুর পর এখান হইতে সেখানে স্থান পরিবর্তিত হচ্ছে, কুকুর-বিড়াল, গৌ-ঘোড়া আদি শরীরে। সংসারের মানুষ এই সত্য দেখতে পায়না, তাই পাপকর্ম ত্যাগ করেনা।
লোকজন ভাবে হরিদ্বার যাবে, গঙ্গা-স্নান করবে তাহলেই পাপমুক্ত হয়ে যাবে। এইজন্যই বেশি সংখ্যক লোকজন পাপ করা থেকে বিরত হয়না। যদি তারা বুঝতে পারে যে- পরমাত্মা পাপের দন্ড অবশ্যই দিবে, জীব-জন্তু আদির শরীর প্রাপ্ত করাবে, ক্ষমা করবে না, তাহলে পাপ করা বন্ধ করে দিবে।
▪️দন্ড ছাড়া কেহ শুধরায় না। যদি বুঝে যে পাপ করলে দন্ডরূপ ফল অবশ্যই পাবে, তাহলে পাপ করবে না। যেমন অগ্নিতে হস্তক্ষেপ করলে তার ফলস্বরূপ হাত পুড়ে যাবে এটা জানলে, বুঝলে, দেখলে কেহ অগ্নিতে হাত দিয়ে রাখেনা। ছল-কপট, চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা আদি পাপকর্মের ফলে জীব-জন্তু, পশু-পাখি, পোকামাকড় আদি শরীর পাবে এটা জানলে, বুঝলে কেহই পাপকর্ম করতে চাইবে না। সকলে শুধরে যাবে। তো সংখ্যা বৃদ্ধি-হ্রাসের ইহাই কারণ।
02/11/2023
# **ষোড়শ সংস্কার**
সংস্কার মানে কি? এই প্রশ্নের বিচার প্রথমে করা প্রয়োজন। কোন দ্রব্যকে উত্তম স্থিতিতে আনয়ন করার নাম সংস্কার, এই প্রকারের স্থিত্যন্তর মানবীয় প্রাণীদের প্রতি হউক, এ কারন আর্য্যগণ ষোড়শ সংস্কারের ব্যবস্থা করিয়াছেন। এই সংস্কার দ্বারা শরীর এবং আত্মা পবিত্র, পরিষ্কৃত এবং সুসংস্কৃত হয়।মানব জীবনকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে গড়ে তোলার সেই ষোড়শ সংস্কার নিম্নরূপ–
# # (১)জন্মের পূর্বে –
**১.গর্ভাধান** [বিবাহোপরান্ত নিজ ইচ্ছানুযায়ী উত্তম সন্তান প্রাপ্তির জন্য]
**২.পুংসবন** [গর্ভাধানের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় মাসে)
**৩.সীমন্তোন্নয়ন** [গর্ভাধানের সপ্তম বা অষ্টম মাসে গর্ভ তথা গর্ভিণীর সুস্বাস্থ্যের জন্য]
# # (২)জন্মের পরে –
**৪.জাতকর্ম** [শিশু জন্মলাভ করার পর-পরই]
**৫.নামকরণ** [জন্মলাভের ১১ দিন বা ১০১দিন অথবা বর্ষোপরান্ত]
**৬.নিষ্ক্রমণম্** [জন্ম হইতে চতুর্থ মাসে শিশুকে গৃহের বাহিরে উপবন, তপোবন বা যেকোন পবিত্র স্থল যে স্থানের বায়ু শুদ্ধ সেখানে ভ্রমণের জন্য নিয়ে যাওয়া]
**৭.অন্নপ্রাশন** [জন্ম হইতে ষষ্ঠ মাসে অন্নাহার শুরু করা বা যখন অন্ন হজম করার সামর্থ্য হবে তখন]
**৮.চূড়াকর্ম (মুণ্ডন**) [শিশুর প্রথম অথবা তৃতীয় বর্ষে প্রথমবার মুণ্ডন করা]
**৯.কর্ণবেধ** [জন্ম হইতে তৃতীয় বা পঞ্চম বর্ষে (বালকের) কর্ণ তথা বালিকার কর্ণ এবং নাসিকা বেধ সংস্কার]
**১০.উপনয়ন বা যজ্ঞোপবীত সংস্কার** [বালক এবং বালিকার পঞ্চম, ষষ্ঠ বা অষ্টম বর্ষে]
**১১.বেদারম্ভ বা বিদ্যারম্ভ সংস্কার** [গুরুকুলে প্রবিষ্ট হওয়ার সময় অথবা যজ্ঞোপবীত সংস্কারের সাথেই]
**১২.সমাবর্তন** [শিক্ষা পূর্ণ হলে বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে]
**১৩.বিবাহ** [যুবক/যুবতী হলে তথা শিক্ষা পূর্ণ করার উপরান্তে]
**১৪.বানপ্রস্থ** [পঞ্চাশ বৎসর হওয়ার পরে বা নিজ সন্তানের সন্তান হওয়ার পর]
**১৫.সন্ন্যাস ** [দৃঢ় বৈরাগ্য এবং যথার্থ জ্ঞান প্রাপ্তির পর, সাধারণত আয়ুর চতুর্থ চরণে]
**১৬.অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া** [মৃত্যুর উপরান্তে মৃতকের দাহকর্ম ]।
আমরা প্রত্যেকটি সংস্কার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত করে বুঝানোর চেষ্টা করবো কিন্তু একটি একটি করে, তো আজ প্রথম সংস্কার বিষয়ে শুরু করছি।
# ** "গর্ভাধান সংস্কার"**
গর্ভধারণ অর্থাৎ গর্ভাশয়ে বীর্যস্থাপন স্থিরীকরণ যে ক্রিয়ার দ্বারা হয় তাহাকে গর্ভাধান বলে। বৈদিক সংস্কৃতিতে গর্ভাধান সংস্কারকে এক নবীন, শ্রেষ্ঠ গুণ, কর্ম, স্বভাবী আত্মাকে সন্তান হিসেবে পাওয়ার জন্য ধার্মিক পবিত্র যজ্ঞ মানা হয়। যেমন উত্তম বৃক্ষ, শস্য উৎপাদন করার জন্য - উত্তম ভূমি, বীজ, খাদ, জল, জলবায়ু তথা তাহার রক্ষাদির জন্য বিশেষ খেয়াল রাখা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনই এক বলিষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ সংস্কারী আত্মাকে সন্তান হিসেবে প্রাপ্ত হওয়ার জন্য গর্ভাধান পূর্বক অনেক প্রকার তৈয়ারি করতে হয়।
আয়ুর্বেদ ও সুশ্রুত সংহিতা অনুসারে গর্ভাধানের জন্য ন্যুনতম বয়স পুরুষের জন্য ২৫ বর্ষ তথা নারীর জন্য ১৬ বর্ষ তো হওয়াই উচিত। এই বয়সটি কোন কারণ বিশেষের জন্যই ন্যুন্যতম হিসেবে বলা হয়েছে পরন্তু এর থেকে বেশি হলেই উত্তম, কেননা ২৫ বর্ষের পুরুষের বীর্য তথা ১৬ বর্ষের কম বয়সী স্ত্রীর বীজ বা গর্ভাশয় অপরিপক্ব হয়ে থাকে, অপরিপক্ব অবস্থায় শ্রেষ্ঠ সন্তান উৎপন্ন হয়না।
বৈদিক মান্যতা অনুসারে দম্পত্তি নিজ ইচ্ছানুসারে (শাস্ত্রের নির্দেশ পালন করার মাধ্যমে) বলবান, রূপবান, বিদ্বান্, গৌরাঙ্গ, বৈরাগ্যবান, সংস্কারী জীবাত্মাকে সন্তান হিসেবে প্রাপ্ত করতে পারবে। এর জন্য - ব্রহ্মচর্য, উত্তম আহার বা বিহার, সাধ্যায়, সৎসঙ্গ, দিনচর্চা, চিন্তন আদির যেমন যোগ্য তেমন পালন করতে হয়। আয়ুর্বেদে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে, বিস্তারিত জানতে আয়ুর্বেদ পড়া উচিত।
এমনটা শুনা যায় যে বিবাহ পশ্চাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাতা রুক্মিণীর নিকট জানতে চেয়েছিলেন যে, তোমার ইচ্ছা কি? উত্তরে মাতা রুক্মিণী দেবী বলেছিলেন যে, আমি তোমার মতো সন্তান চাই। তারপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে আমার ন্যায় সন্তান প্রাপ্ত করতে হলে, আমাদের দুজনকে ১২ বর্ষ পর্যন্ত এক একান্ত স্থানে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে, তারপর দুজন এমনটাই করেছেন। তখন প্রদ্যুম্ন যেমন সন্তান উৎপন্ন হয়েছিলো, যে কিনা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় সম গুণবান হয়েছিলো। এই ১২ বর্ষ তাঁহারা রজ-বীর্যের পুষ্টি, শ্রেষ্ঠ সংস্কারের শ্রেষ্ঠতা আদি গুণ বৃদ্ধির জন্য লাগিয়েছিলেন।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে গর্ভাধানের পূর্বে বা গর্ভাধানের সময় মাতা-পিতার যেমন শারীরিক বা মানসিক স্থিতি হয়ে থাকে তেমন প্রভাব তাহাদের গর্ভাশয়ের সন্তানের উপর পরে। এই কারণসমূহের ধ্যান রেখেই ঋষিগণ অনেক প্রকার বিধি নির্দেশ করেছেন।
উপরোক্ত অবস্থার পরেও গর্ভাবস্থার দশ মাস পর্যন্তও অনেক মহত্ত্বপূর্ণ, এই অবস্থায় বিধি নিষেধ না মেনে ভুল কিছু করলে খুব সুন্দরভাবে পালিত গর্ভাধান সংস্কারের মাধ্যমে সন্তান প্রাপ্তির ক্রিয়ার উত্তম ফলাফল হবেনা।
উদাহরণ - ধরুন আপনি একটি জমির ভূমিকে উত্তমভাবে সংস্কার করে বিধির সহিত উত্তম বীজ বপন করলেন উত্তম ফসল পাওয়ার জন্য। কিন্তু এর পর পরিচর্যা করলেন না, আপনার মাধ্যমে বা অন্য কারণে ময়লা-আবর্জনা জমিতে প্রয়োগ হলো যা কিনা উত্তম ফসলের জন্য ক্ষতিকর। এরপরও কি আপনার প্রথমে করা উত্তম সংস্কার পালনের পরও উত্তম ফসল পাবেন?
সুতরাং গর্ভাধান সংস্কার পালনের পরও আরও বিধি নিষেধ রয়েছে, যা অবশ্য পালনীয় উত্তম সন্তান প্রাপ্তির জন্য।।
# ©️ আর্য প্রতিনিধি সভা বাংলাদেশ
21/10/2023
. 📚 হনুমান কি বানর (monkey) ছিল!!!📚
পবনসুত হনুমান, রামায়ণের এক বহুল আলোচিত চরিত্র। রামচন্দ্রের প্রতি ভক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত, প্রভুভক্তির এক মূর্তিমান স্বরূপ। অনেককাল থেকেই হনুমানের কথিত ভক্তরা তাঁকে লেজযুক্ত বানর (monkey) বলে মনে করেন এবং মান্যতার সহিত মিথ্যাভক্তি ও প্রচার করেন। মূলত বানর শব্দ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে রামায়ণে সেটার বিচার করা এখানে আবশ্যক। সাধারণত রূঢ় অর্থে বানর অর্থ বানর (monkey) বুঝায়। যোগরূঢ় অর্থে "বানর" শব্দ দ্বারা 'বন মধ্যে উৎপন্ন হওয়া অন্ন ভোজনকারী' বুঝায় । যেমন পর্বত অর্থাৎ গিরিমধ্যে অবস্থানকারী এবং সেখানকার অন্ন গ্রহনকারী কে "গিরিজন" বলে। তেমনই বন মধ্যে উৎপন্ন হওয়া অন্ন ভোজনকারী ও অবস্থানকারীকে 'বানর' বলা হয়। হনুমান এবং তাঁহার স্বজনরা বনমধ্যে উৎপন্ন হওয়া ফলমূলাদি ভোজন করতেন এবং অবস্থান করতেন তাই তাঁদের 'বানর' বলা হতো। আমরা কিছু প্রশ্ন-সমাধানের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করি যে হনুমান বানর (monkey) ছিল নাকি মনুষ্য!
◾১. (ক) বানর কি মানুষের মতো কথা বলতে পারে?
(খ) বানর কি লেখা-পড়া করে উচ্চকোটির বিদ্বান্ হতে পারে?
☞বানর (monkey) মনুষ্যের ন্যায় কথা বলতে পারেনা, এটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধ। এটি সাধারণ হইতে বিজ্ঞানমনস্ক ব্যাক্তিরাও মানেন যে, বানর (monkey) মনুষ্যের ন্যায় কথা বলতে পারে না এবং পারতোও না। আর কোন বানর (monkey) লেখা-পড়া করে উচ্চকোটির বিদ্বান্ হতে পারে এটি হাস্যকর ছাড়া আর কিইবা ভাববে বিবেক-বুদ্ধির ব্যবহার করতে জানা মনুষ্যজন! কিন্তু রামায়ণে দেখা যায় হনুমান মনুষ্যের ন্যায় কথা বলতেন এবং উচ্চকোটির বিদ্বান্ ব্যক্তিও ছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ম্ ঋচ্যমূক পর্বতে হনুমানের সহিত প্রথম সাক্ষাৎকারে কথন করে, ভ্রাতা লক্ষ্মণকে বলেছেন -
নানৃগ্বেবেদবিনীতস্য নাযজুর্বেদধারিণঃ।
নাসামবেদবিদুষঃ শক্যমেবম্ প্রভাষিতুম্।।”
-------বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৩/২৮
অনুবাদ : এই হনুমান উচ্চকোটির বিদ্বান্ ব্যক্তি, কেননা ঋগ্বেদ অধ্যয়নে অনভিজ্ঞ, যজুর্বেদের জ্ঞানহীন এবং সামবেদের বোধ শূণ্য ব্যক্তি এরূপ পরিষ্কৃত কথন করতে পারবেন না।
নূনং ব্যাকরণং কৃত্স্নমনেন বহুধা শ্রুতম্।
বহু ব্যাহরতানেন ন কিঞ্চিদপশব্দিতম্।।
-------বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৩/২৯
অনুবাদ : নিশ্চয়ই তিনি ব্যাকরণ শাস্ত্র অনেকবার অধ্যয়ন করেছেন, কারন এই যে - এতক্ষণ যাবৎ কথনের মধ্যে তিনি কোন ত্রুটিই করেননি।
◑ শুধু তাহাই নয় একজন সত্যিকারের উত্তম মনুষ্যের গুণসম্পন্ন ছিলেন হনুমান। তা তাঁহার কথনের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। শ্রীরামচন্দ্রও বলেছেন -
ন মুখে নেত্রয়োর্বাপি ললাটে চ ভ্রুবোস্তথা।
অন্যেষ্বপি চ গোত্রেষু দোষঃ সংবিদিতঃ ক্বচিত্ ॥
-------বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৩/২৯
অনুবাদ : বাক্য প্রয়োগ কালে তাঁহার মুখ, নেত্র, ললাট, ভ্রমধ্যে তথা অপর কোন অঙ্গেই বিন্দুমাত্রও কোন বিকার বা দোষ দেখা যায়নি।
অবিস্তরমসন্দিগ্ধমবিলম্বিতমদ্রুতম্।
উরঃস্থং কণ্ঠগং বাক্যং বর্ততে মধ্যমে স্বরে ॥
-------বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৩/৩১
অনুবাদ : তাঁহার ভাষণ সংক্ষিপ্ত, পরন্তু সন্দেহরহিত। নিজ কথন ব্যক্ত করার সময় না তো শীঘ্রতা করেছে আর না বিলম্ব করেছে। তাঁহার হৃদয়ের বাক্য যখন কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, তখন তাঁহার স্বর না উচ্চ হতো আর নাতো খুব নিম্ন হতো, অপিতু মধ্যম স্বর হতো।
সংস্কারকমসম্পন্নামদুতামৰিলম্বিতাম্।
উচ্চারয়তি কল্যাণীং বাচং হৃদয়হারিণীম্॥
-------বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৩/৩২
অনুবাদ : তাঁহার বাণী ব্যাকরণ দ্বারা সংস্কারিত, ক্রম সম্পন্ন তথা না তো খুবই ধীরে বলেছে আর নাতো খুব শীঘ্র বলেছে। তাঁহার বাণী (বাক্য) হৃদয়কে হর্ষিত করার মতো এবং খুবই মধুর।
হনুমান ছিলেন সর্বশাস্ত্রবিশারদ (বাল্মীকি রামায়ণ-৪/৫৪/৫)
◑স্বয়ম্ হনুমানজী অশোক বাটিকা মধ্যে সীতাকে নিজ পরিচয় দেবার পূর্বে চিন্তা করলেন যে-
যদি বাচম্ প্রদাস্যামি দ্বিজাতিরিব সংস্কৃতাম্।
রাবণম্ মন্যমানা মাম্ সীতা ভীতা ভবিষ্যতি।।
---------(বাল্মীকি রামায়ণ -৫/৩০/১৮)
অনুবাদ : যদি আমি দ্বিজাতির (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) ন্যায় পরিমার্জিত সংস্কৃত ভাষা প্রয়োগ করি তাহলে আমাকে রাবণ ভেবে, সীতা ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে যাবে।
[তাই এমন কোন উপায় খুঁজতে হবে যা দ্বারা সীতা আমার কথাও শুনবে কিন্তু ভয়ে ভীত হবে না]
◑এর দ্বারা প্রমাণিত যে হনুমানজী মহান্ বিদ্বান্ ব্যাক্তি ছিলেন। তিনি ব্যতিতও অন্য সুগ্রীব, অঙ্গদ ও তারা সহ অনেক বানরই বৈদিক বিদ্বান্ ছিলেন। অঙ্গদ সম্পর্কে হনুমানজী বলেছেন -
বুদ্ধ্যা হ্যষ্টাঙ্গয়া যুক্তম্ চতুর্বলসমন্বিতম্।
চতুর্দশ গুণম্ মেনে হনুমান্ বালিনঃ সুতম্।।
---------(বাল্মীকি রামায়ণ -৪/৫৪/২)
অনুবাদ : বালীপুত্র অঙ্গদ অষ্টাঙ্গ বুদ্ধিসম্পন্ন, চার প্রকার বলযুক্ত এবং রাজনীতির চৌদ্দ প্রকার গুণে সমলঙ্কৃত।
✔ বুদ্ধির অষ্ট অঙ্গ : ১.শ্রবণ করার ইচ্ছা, ২.শ্রবণ করা, ৩.বুঝা, ৪.শ্রবণ করে ধারণ করা, ৫.উহাপোহ করা , ৬.অভিপ্রায় জানা , ৭.বিজ্ঞান, ৮.তত্বজ্ঞান।
✔ চার প্রকার বল : ১.শাম, ২.দান, ৩.ভেদ, ৪.দণ্ড।
অথবা - ১.বাহুবল, ২.মনোবল, ৩.উপায়বল, ৪.বন্ধুবল।
✔ রাজনীতির চৌদ্দ গুণ : ১.দেশ কালের জ্ঞান, ২.দৃঢ়তা, ৩.কষ্টসহিষ্ণুতা, ৪.সর্ববিজ্ঞানতা, ৫.দক্ষতা, ৬.উৎসাহ, ৭.মন্ত্রগুপ্তি, ৮.একবাক্যতা, ৯.শুরতা, ১০.ভক্তিজ্ঞান, ১১.কৃতজ্ঞতা, ১২.শরনাগতবৎসলতা, ১৩.অমর্ষিত্ব = অধর্মের জন্য অসহিষ্ণুতা, ১৪.অচপলতা = গম্ভীরতা।
এত গুণ বানরের তো দূরের কথন, বর্তমান কোন মনুষ্যের আছে কিনা সন্দেহ হয়। এত আধুনিক যুগের বানরের যেখানে এত গুণ নেই তাহলে পূর্বকালীন বানর (monkey) কি এত গুণসম্পন্ন হতে পারে?
◾২. বানরদের কি মানুষের মতো আলাদা আলাদা নাম থাকে?
☞আমরা সকলেই জানি যে, মানুষের ন্যায় বানরদের আলাদা আলাদা নাম থাকেনা। কিন্তু রামায়ণে উল্লেখিত বানরদের আলাদা আলাদা নাম ছিল, যেমন -
ক. সুগ্রীব (বাল্মীকি রামায়ণ -৪/২/১)
খ. হনুমান (বাল্মীকি রামায়ণ -৪/২/১৩)
গ. বালী (বাল্মীকি রামায়ণ -৪/২/১৪)
ঘ.অঙ্গদ (বাল্মীকি রামায়ণ -৪/৫৪/১)
ঙ.তারা (বাল্মীকি রামায়ণ -৪/১৫/৬)........
অনেকেই হয়তো বলতে পারেন যে, যারা বানর খেলা দেখায় তারা তো নিজেদের পোষা বানরের আলাদা আলাদা নাম রাখেন, তো এক্ষেত্রে এইসকল কথন গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা উপরোক্ত নামের বানরেরা কারো পোষ্য ছিলনা, এরূপ প্রমাণও পাওয়া যায়না।
◾৩. বানর কি রাজা, রাজকুমার, মন্ত্রী হতে পারে?
☞রাজা, রাজকুমার, মন্ত্রী এইসকল যে কেবল মানুষই হয় /হয়েছিল সেটা সকলেই জানে এবং মানে। বানরের দ্বারা রাজা,মন্ত্রী আদি হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু রামায়ণে উল্লেখিত বানরদের, রাজা-রাজকুমার-মন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন -
ক. 'বালী' ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের রাজা।
খ. 'অঙ্গদ' ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের রাজকুমার।(বাল্মীকি রামায়ণ -৪/১৫/১৫)
গ. 'সুগ্রীব'ও ছিল কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের রাজা।
ঘ. 'হনুমান' ছিলেন সুগ্রীবের মন্ত্রী।
ঙ. 'তারা' ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের রানী।........👇
উপরোক্ত লিখার তথ্যসূত্র-(বাল্মীকি রামায়ণ কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড)
এই সকল বিভ্রান্তি তাদেরই হয়, যে বা যাহারা রামায়ণে উল্লেখিত হনুমানজী সহ অন্য বানরদের monkey বলে মনে করেন। আমাদের আর্যদের মনে এমন বিভ্রান্তি উৎপন্ন হয় না কারণ আমরা জানি এবং মানি যে, রামায়ণে উল্লেখিত বানরেরা আমাদের ন্যায়ই মনুষ্য, কোন monkey নয়।
◾৪. বানরের যেরূপ লেজ থাকে, হনুমানেরও সেরূপ লেজ ছিল বলিয়া রামায়ণে প্রমাণ আছে। এই বিষয়ে কি বলবেন?
☞ উপরোক্ত তথ্য দ্বারা অন্তত এটা তো প্রমাণিত হয়েছে যে, রামায়ণে উল্লেখিত বানরেরা monkey ছিলনা। তাঁরাও আমাদের ন্যায় মনুষ্য দেহধারী ছিল এবং তাঁহারা মহামানব ছিল। লেজ ছিল তাঁদের আভূষণ। রাবণের সহিত হনুমান যখন কথা বলছিল তখন এক পর্যায়ে রাবণ বলেছেন -
কপিনাং কিল লাঙ্গুলমিষ্টং ভবতি ভূষণম্।।
-------(বাল্মীকি রামায়ণ -৫/৫৩/৩)
অর্থাৎ বানর জাতি লোকের জন্য তাদের 'লাঙ্গুল' খুবই প্রিয় এবং উত্তম আভূষণ।
আভূষণ যে আভূষণধারী ব্যক্তি হইতে আলাদা কিছু তা আমরা সকলেই জানি। জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতী রামায়ণ ভাষ্যের টিপ্পনীতে লিখেছেন - 'লাঙ্গুল' ছিল বানরজাতির রাষ্ট্রীয় চিহ্ন, ইহাকে তাঁহারা খুবই শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন তথা ইহার অপমানকে জাতীয় অপমান মনে করতেন। রাবণ ইহাকেই জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন-(বা০ রা০-৫/৫৩/৪)। লাঙ্গুল বানরের লেজ সদৃশই ছিল, যা হনুমান ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তা হনুমান সহ অন্য বানরজাতির শরীরের বাস্তবিক অঙ্গ ছিলনা।
➤এই বিষয়ে, গবেষক 'ডা. শান্তিকুমার নানুরাম ব্যাস' লিখেছেন -
বানরদের সংস্কৃতিকে মহান এবং সমুন্নত অঙ্কিত করা হয়েছে। সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক তথা বালীর অন্ত্যেষ্টি দুইই বৈদিক বিধিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। সুগ্রীব, হনুমান তথা অঙ্গদের যে প্রভাবশালী চিত্রণ কবি [বাল্মীকি মুনি] করেছেন তা তাঁদের মহান সংস্কৃতির সূচক। বানরদের সম্পত্তি-বৈভব, বসনাভরণ, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্ম-কর্ম তথা সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনের বর্ণন হতে স্বাভাবিক নিষ্কর্ষ ইহাই হয় যে, রামায়ণকার রামের সহযোগীদের বস্তুত বানর (monkey) মানতেন না।
এই জাতির যে নামের উল্লেখ রামায়ণে রয়েছে তার মধ্যে 'বানর' শব্দ ১০৮০ বার প্রযুক্ত হয়েছে, এবং এর পর্যায়রূপে- 'বনগোচর', 'বনকোবিদ', 'বনচারী', 'বনৌকস' শব্দ রয়েছে। এর দ্বারা এটা স্পষ্ট যে 'বানর' শব্দ monkey এর সূচক নয় বরং বনবাসীর দ্যোতক। এর ব্যুৎপত্তি এইপ্রকার করা উচিৎ - বনসি (অরণ্যে) ভব চরো বা ইতি বানর = বনৌকস, আরণ্যক। বানরদের জন্য 'হরি' শব্দ ৫৪০ বার, প্লবগ শব্দ ২৪০ বার, কপি শব্দ ৪২০ বার প্রযুক্ত হয়েছে।...............
রামায়ণে উল্লেখিত বানরদের মনুষ্য মানতে সবথেকে বড় বাধক এই লেজ। কিন্তু সূক্ষভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, এই লেজ, হাত-পায়ের মতো শরীরের অভিন্ন অঙ্গ না হয়ে বানরদের এক বিশিষ্ট জাতীয় নিশান ছিল, যা আলাদা লাগানো হতো শরীরে। সেজন্যই হনুমানের লেজে আগুন লাগানোর পরেও, হনুমানের শারীরিক কোন কষ্ট অনুভব হয়নি।....
--------রামায়ণ-কালীন সমাজ/পৃষ্ঠা-৭১,৭২
প্রকাশকাল : ১৯৫৮
➤রামায়ণে উল্লেখিত বানরেরা মনুষ্য হওয়া সত্ত্বেও বানর বলার কারণ হিসেবে আরো একটি তথ্য গবেষক ক্ষিতিমোহন সেন এম. এ. লিখেছেন-
আর্যদের পূর্ববর্তী অনেকেই নিজ পরিচয় কোন জীব-জন্তু অথবা বৃক্ষ-লতা আদির নাম দ্বারা দিয়ে থাকতেন।....নানা দেশে অতি প্রাচীন কাল হইতে এক বিশেষ চিহ্ন বা লাঞ্ছন দ্বারা পরিচয় দেওয়ার রীতি দেখা যায়। এই চিহ্ন সাধারণত কোন জীব-জন্তুর হয় নয়তোবা বৃক্ষ-লতা এবং পুষ্পের হয়। যে বস্তু চিহ্ন বা লাঞ্ছন রূপে ব্যাবহার হয়, সেই বস্তু সেই জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট শ্রদ্ধা ও সম্মানের বস্তু। ইংরেজিতে ইহাকে টোটেম (Totem) বলা হয়। ছোটকালে রামায়ণে- বানর এবং ভাল্লুককে মনুষ্যোচিত ব্যাবহার করতে দেখে, বড় কৌতূহল হতো। বড় হয়ে বুঝতে পারলাম এখনো নিজেকে বানর এবং ভাল্লুকের বংশধর পরিচয় দেয় এমন লোক এদেশে আছে। আরো পরে বুঝতে পারলাম এইসব টোটেমরই ব্যাপার।
--------- ভারতবর্ষমে জাতিভেদ /পৃষ্ঠা-১০৫
প্রকাশকাল : ১৯৪০
➤রামায়ণেই দেখা যায়, হনুমানের সহিত মাতা সীতা প্রথম কথনের শুরুতে হনুমানকে বলেছেন -
সুরাণাম্ অসুরাণাম্ চ নাগ গন্ধর্ব রক্ষসাম্ |
যক্ষাণাম্ কিম্নরাণাম্ চ কা ত্বম্ ভবসি শোভনে ||
----------বাল্মীকি রামায়ণ-৫/৩৩/৫
অর্থাৎ হে শোভনে! সুর, অসুর, নাগ, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, রাক্ষস,কিন্নরের মধ্যে আপনি কোন কুলের।
দেখুন যদি হনুমান বানরই হতো তাহলে এটা জিজ্ঞেস করার কি আছে যে - সে নাগ, কিন্নরাদি কিনা? আবার এখানে মানুষ কিনা তাও জিজ্ঞেস করেনি। করার কথাও নয়, কেননা কোন মনুষ্য অন্য কোন মনুষ্যের পরিচয় জানতে কি জিজ্ঞেস করে তুমি কি মানুষ অথবা সর্প, বানর, পাখি কিনা?
তাছাড়াও মহাভারতেও বিভিন্ন জাতির নাম উল্লেখ পাওয়া যায় । যারা মনুষ্য কিন্তু জাতির নাম কোন পশু-পাখি আদির নামে। মহাভারত/ভীষ্মপর্ব/নবম অধ্যায়ের ৫৬-৬৫ শ্লোকে - কুকুর, কাক..... ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য নামের উল্লেখ রয়েছে।
➤জাতি বলতে কি বুঝিয়েছেন?
মহর্ষি গৌতম প্রণীত নায়দর্শন-২/২/৭১ সূত্রের ভাষ্যে, স্বামী দর্শনানন্দ সরস্বতী একটি প্রশ্নোত্তর লিখেছেন জাতি বিষয়ে। যথা-
প্রশ্ন- জাতি কত প্রকার?
উত্তর : জাতি দুই প্রকার। ১.সামান্য ২.বিশেষ। যেমন মনুষ্য জাতি সামান্য, এর মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়াদি বা শ্বেত-কৃষ্ণাদি, বা দেশভেদ অথবা আচার ভেদের জন্য অবান্তর জাতি তৈরি হয়।
এখানে জাতি বলতে জাতির বিশেষ অর্থটিই বুঝানো হয়েছে।
✍️প্রিয়রত্ন বিদ্যার্থী
©️আর্য প্রতিনিধি সভা বাংলাদেশ
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Address
Delhi