Ratibati Colliery
29/01/2026
অন্তরালে:
শীতের সন্ধ্যা। নবপল্লীর নতুন ফ্ল্যাটবাড়ির দোতলায় তখন তারুণ্যের কল্লোল। ঘরের দেয়ালে দামী প্লাস্টিক ইমালশন, মেঝেতে শ্বেতপাথরের শীতল জেল্লা। নীলার বন্ধুদের আড্ডায় ঘর ম-ম করছে কফি আর দামি পারফিউমের গন্ধে।
নীলা এ বাড়ির গিন্নী, সদ্য বিবাহিতা। তার স্বামী বাবুল এই এলাকার উদীয়মান ডাক্তার। রোগীদের ভিড় সামলে তার ফিরতে দেরি। বন্ধুদের মাঝখানে বসে নীলা যখন খিলখিল করে হাসছিল, তখনই পর্দার ওপাশে একটা ছায়া থমকে দাঁড়াল।
লাঠি হাতে এক বৃদ্ধ। পরনে একটা পুরনো খদ্দরের চাদর, যা সময়ের ঘষায় অনেকটা বিবর্ণ। তিনি অবিনাশবাবু, বাবুলের বাবা। কাঁপা গলায় ঘরের দরজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, বলি, ও বৌমা, বাবুল কি ফিরল?
নীলার ভ্রু কুঁচকে গেল। বন্ধুদের সামনে এই পুরনো মানুষটার উপস্থিতি যেন তার রুচিতে লাগল। সে উত্তর দেওয়ার আগেই সত্যব্রত বলে উঠল, "আসুন মেসোমশাই, ভেতরে আসুন।
অবিনাশবাবু ইতস্তত করে ঢুকলেন। সত্যব্রতের পাশে বসতে বসতে বললেন, তোমরা সব বাবুলের বন্ধু? ও খুব মেধাবী ছিল ছোট থেকে, বুঝলে? হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাত জেগে পড়ত আর মনোরমা (বাবুলের মা) পাশে বসে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে করে ঘুমে ঢুলে পড়তো!
নীলা আর সহ্য করতে পারল না। গম্ভীর মুখে শাসনের সুরে বলল, বাবা, আপনি ওঘরে যান। অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ুন গিয়ে। আমরা একটু জরুরি গল্প করছি।
বৃদ্ধের মুখের উজ্জ্বলতা নিমেষে নিভে গেল। তিনি তড়িঘড়ি উঠতে গেলেন, কিন্তু সত্যব্রত তাঁর হাতটা চেপে ধরল। শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে সে নীলাকে বলল, বসুন জেঠু। নীলা, ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। জরুরি গল্প তো ওনার সঙ্গেই হতে পারে।
বাকি বন্ধুরা আড়ষ্ট হয়ে উঠল। নীলা বিরক্তিভরা গলায় বলল, "সত্য, তুই সব ব্যাপারেই একটু বেশি করিস। বাবার শরীর ভালো না, ওঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই ভালো।
অবিনাশবাবু ম্লান হেসে বললেন, "ঠিকই তো মা, আমার বসার ক্ষমতা কমেছে। একটানা বসলে মাজাটা টনটন করে। তা তোমরা রাতে খেয়ে যেও বাবা।" তিনি ধীর পায়ে পাশের অন্ধকার ঘরের দিকে চলে গেলেন।
নীলার এক বন্ধু উপহাসের সুরে বলল, কিরে সত্য, তুই তো দেখছি 'আইডিয়াল সুপুত্র' হওয়ার প্র্যাকটিস করছিস! তা বুড়োটার জীবনকাহিনী আর কতটা বাকি?
সত্যব্রত এবার উঠে দাঁড়াল। জানালার ওপাশে তাকিয়ে সে শান্ত গলায় বলল, জানিস নীলা, এই ফ্ল্যাটের পাথুরে মেঝেতে যে আরাম আজ তোরা পাচ্ছিস, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে এই বৃদ্ধের পঁচিশ বছরের উপবাসে। বাবুল আজ ডাক্তার, কারণ ওর বাবা পুজোর নতুন জামা কেনেননি, নিজের চিকিৎসার টাকা বাঁচিয়ে ছেলের টিউশন ফি দিয়েছেন। আজ তোরা যখন আড্ডা দিচ্ছিস, তখন একবার ভেবে দেখেছিস এই ঘরে তোদের আসার অধিকার তৈরি করে দিয়েছেন ওই মানুষটাই?
ঠিক এই সময় সদর দরজার চাবি ঘোরার শব্দ হলো। বাবুল ঘরে ঢুকেছে। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। সত্যব্রত তার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবুল, বাইরে থেকে রোগী দেখে আসছিস তো ঠিক আছে, কিন্তু ঘরের সবচেয়ে বড় পেশেন্ট যে একাকীত্বে ভুগছে, তাকে কি একবার দেখেছিস? উনি তোদের কাছে টাকা চান না রে, শুধু একটু মানুষের সঙ্গ চান।
বাবুল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নীলাও মাথা নিচু করে সোফার কোণায় বসে রইল। সত্যব্রত তার ব্যাগটা তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল: "তুই আজ মোহনায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের গর্জন শুনছিস নীলা, বড় সুন্দর সেই শব্দ। কিন্তু মনে রাখিস, পাহাড়ের কোনো এক নির্জন কোণে পাথর খুঁড়ে যে ঝর্ণাটা বেরিয়েছিল, সে নিজের অস্তিত্ব ক্ষয় করে জল দিয়েছিল বলেই আজ তুই মোহনায় দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনতে পারছিস। পাহাড়কে অস্বীকার করে সমুদ্রের পূজা করা যায় না। নদীর উৎসে যদি টান পড়ে, তবে মোহনাও একদিন ধূ ধূ মরুভূমি হয়ে যাবে।"
©নরকিচাক্ষ
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Address
Chanda To Ratibati
Asansol