RS Rakib
Fictional Series-Part 1
যুক্তি ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব-
পথে চলতে চলতে তার কথাগুলি আমার মনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছিল। ‘বিশ্বাস’, ‘ঈশ্বর’, ‘সত্য’—এগুলো কি আসলে এত সহজ ছিল? আমি হাঁটছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল, কিছু একটা মনের মধ্যে আটকে আছে। যেন একটা বদ্ধ রাস্তা, যার শেষ কোথাও নেই।
জায়ানের কথা বলছি। আমার ছোটবেলার বন্ধু জায়ান। এখন সে ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ছে। আমাদের এই ছোট মফস্বল শহরে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষ পাশাপাশি বাস করি। শৈশবের দিনগুলো ছিল সহজ আর আনন্দময়। জায়ান বরাবরই চুপচাপ, তবে ওর চোখে সবসময় একটা গভীর জানার আগ্রহ খেলা করত। ওর সেই অনুসন্ধিৎসু মনটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
ছোটবেলায় ধর্ম নিয়ে আমাদের মনে বিশেষ কোনো জটিলতা ছিল না। তবে কৈশোরে পা দেওয়ার পর থেকেই জায়ানের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করি। ও প্রায়শই এমন সব প্রশ্ন তুলত যা আমাদের सोचने বাধ্য করত। যেমন, একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা অরিত্র, আমরা যা কিছু বিশ্বাস করি, সেগুলো নিয়ে কি প্রশ্ন করা উচিত নয়? মানে, সবকিছু কি শুধু শুনে শুনেই মেনে নেব?” আমি সেদিন ওর কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। শুধু বলেছিলাম, “বড়রা যা বলেন, তা তো মানতেই হয়।” জায়ান সেদিন আর কিছু বলেনি, শুধু একটা আবছা হাসি হেসেছিল। ওর সেই প্রশ্নগুলোই যে ওর আগামী দিনের পথ তৈরি করে দেবে, তা কে জানত!
সময় গড়িয়েছে। জায়ান এখন তার পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে। আমি অরিত্র, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, থাকি ঢাকায়। হোস্টেলের চার দেওয়ালের বাইরে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ আগের চেয়ে কম হয়, কিন্তু যোগাযোগটা এখনও অটুট। কিছুদিন আগে ইউটিউবে ঘুরতে ঘুরতে একটা চ্যানেলে চোখ আটকে গেল – । বক্তার মুখ স্পষ্ট না দেখা গেলেও কণ্ঠস্বরটা ভীষণ চেনা… এ যে জায়ান! ভিডিওতে সে ধর্ম, দর্শন আর যুক্তি নিয়ে কথা বলছিল। তার উপস্থাপনার ভঙ্গি ছিল শান্ত, কিন্তু প্রতিটি কথায় যুক্তির জোর। সে বলছিল কীভাবে মানুষ তার বিশ্বাসকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারে, কীভাবে বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তা আমাদের জীবনবোধকে প্রভাবিত করে। ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার নিজের ভেতরেও অনেক প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল।
কয়েকদিন পর ছুটিতে বাড়ি এসে জায়ানের সাথে দেখা। পুরনো আড্ডাস্থল, পুকুরপাড়ে বসেছিলাম দুজনে। চাঁদের আলোয় চারপাশটা মায়াবী লাগছিল। আমিই প্রথম নীরবতা ভাঙলাম, “তোর ইউটিউব চ্যানেলটা দেখেছি, জায়ান।”
জায়ান আমার দিকে তাকাল, চোখেমুখে সেই পরিচিত শান্ত ভাব। বলল, “কেমন লাগল?”
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “ভালো। তবে কিছু বিষয় নিয়ে মনে প্রশ্ন জেগেছে। যেমন, তুই যে বলিস, বিশ্বাসকে যুক্তির আলোতে দেখতে হবে… কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা আচার-অনুষ্ঠান, যেগুলোর সাথে আমাদের আবেগ জড়িয়ে, সেগুলোকে শুধু যুক্তি দিয়ে বিচার করা কি ঠিক?”
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি বলছি না যে আবেগ বা ঐতিহ্যের কোনো মূল্য নেই, অরিত্র। অবশ্যই আছে। এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সেইসাথে এটাও তো দেখা দরকার যে সেই বিশ্বাস বা আচারের মূল ভিত্তিটা কী, সেটা আমাদের চিন্তাকে কতটা প্রসারিত করছে, নাকি সংকীর্ণ করে দিচ্ছে। জানার আগ্রহ, প্রশ্ন করা—এটা তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের বোঝাপড়াকে আরও গভীর করতে পারি। ধর, আমরা কোনো একটা কাজ করছি কারণ সবাই করছে। কিন্তু কেন করছি, তার পেছনে সত্যিকারের কোনো সারবত্তা আছে কিনা, সেটা ভেবে দেখা কি অন্যায়?”
আমি বললাম, “কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিশ্বাসকে প্রশ্ন করলে তো অনেকের মনে আঘাত লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে কী করা উচিত?”
জায়ান মৃদু হেসে বলল, “আঘাত করাটা উদ্দেশ্য নয়, অরিত্র। উদ্দেশ্য হলো আলোচনা করা, ভাবনার আদান-প্রদান করা। সত্যকে জানতে হলে খোলা মনে প্রশ্ন করতে হবে, আবার অন্যের মত শোনারও ধৈর্য্য থাকতে হবে। আমি যখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি, তখন চেষ্টা করি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করে মূল ধারণাটা নিয়ে আলোচনা করতে। আমার লক্ষ্য হলো মানুষকে আরও বেশি চিন্তাশীল করে তোলা, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের পথ খুঁজে নিতে পারে।”
ওর কথাগুলো আমার মনে গভীর ছাপ ফেলল। জায়ান তার বিশ্বাসের প্রতি অবিচল, কিন্তু তার प्रस्तुতিতে কোনো রূঢ়তা নেই। সে চায় মানুষ যেন অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে বিচার-বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসকে যাচাই করে নেয়।
হঠাৎ বৃষ্টি নামল। আমরা দুজনে উঠে দাঁড়ালাম। রাতের নিস্তব্ধতা আর বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে জায়ানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “অরিত্র, আমি তোকে কখনও বলিনি আমার মতো করে ভাবতে। আমি শুধু চেয়েছি, তুই যেন চোখ বন্ধ করে কিছু বিশ্বাস না করিস। প্রশ্ন কর, জানার চেষ্টা কর। সত্যের সন্ধান করাটাই তো মানুষের আসল কাজ।”
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, নাকি ওটা চোখের জল, বুঝতে পারছিলাম না। সেই রাতে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারিনি। জায়ানের প্রশ্নগুলো, ওর বিশ্বাসের দৃঢ়তা, ওর শান্ত অথচ বলিষ্ঠ যুক্তি – সবকিছু মিলে আমার ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। একদিকে বহুদিনের লালিত সংস্কার, অন্যদিকে বন্ধুর দেখানো নতুন পথের হাতছানি। মনে হচ্ছিল, এক গভীর অতল গহ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি, যেখানে আলোও নেই, অন্ধকারও নেই, আছে শুধু অনন্ত জিজ্ঞাসা। আমার ভেতরের আমিটাও যেন সেই জিজ্ঞাসার বাঁকে পথ চলতে শুরু করেছে।.........more coming soon. (Part 1. Introduction). Full Fictional.
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Telephone
Website
Address
Satkhira