eTimes24
The Bio
"Etimes24 is a leading online news portal that delivers the latest news, entertainment, politics, sports, and business updates from around the world 24/7." If you have any more questions about our policy please mail us at :[email protected]
Messenger m.me/etimes24
Gmail: [email protected]
30/05/2026
জিয়া হত্যাকান্ডঃ কেন ও কিভাবে হয়েছিলো?
জিয়াকে কারা হত্যা করেছিলো- কেন করেছিলো এবং কথিত হত্যাকারীদের বিচার নিয়ে আমি এই লেখায় যেই আলাপ উঠাতে এবং একইসাথে বিশ্লেষন করতে যাচ্ছি সেখানে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে আমি আস্তে আস্তে বাকি প্রসঙ্গে ঢুকে যাবো।
শফিউল্লাহ কি জিয়াকে ভয় পেত?-
জেনারেন শফিউল্লাহ ১৯৭৩ সালে যখন সেনাবাহিনীর চীফ হলেন, এই পদ পেয়ে শফিউল্লাহ ভীত হয়ে পড়েন। যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ট্রায়ালে তিনি এই ভীত শব্দকে ‘প্রতিবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং শফিউল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি এই পদোন্নতির ‘প্রতিবাদ’ করেছিলেন।
একটা কথা বরাবরই আমার কাছে অত্যন্ত দূর্বোধ্য যে, কাউকে পদোন্নতি দিলে সেই ব্যাক্তি সেটি না নিয়ে ঠিক কিভাবে প্রতিবাদ করেন। সেই ব্যাক্তি অনীহা প্রকাশ করতে পারেন, বিনীতভাবে সেই পদ না নিতে পারেন কিন্তু 'প্রতিবাদ' আবার কেমন ধরনের শব্দ?
কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ট্রায়ালে শফিউল্লাহর জবানবন্দীতে তিনি এই শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যদিও শফিউল্লাহকে বলেছিলেন অনেক সিদ্ধান্ত থাকে যা রাজনৈতিক এবং সে কারনেই শফিউল্লাহকেই সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নেয়া। [সুত্র-১]
শফিউল্লাহর নিজের জবানীতেই আমরা জানতে পারি পদোন্নতি পেয়েই তিনি তার বন্ধু জিয়াকে ফোন দেন [সূত্র-২] এবং এই পদোন্নতির সংবাদ জানান।
শফিউল্লাহর এই ফোন নিছকই এক বন্ধুকে আনন্দের সংবাদ জানাবার জন্য যে নয় সেটি শফিউল্লাহর বক্তব্য থেকেই খুবই পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়।
এই ফোন কল ছিলো একজন ভীত-কাপুরুষের ফোন কল যেখানে নিজেকে ‘অপরাধী ও অযোগ্য’ মনে করা এক মানুষ তার চাইতে ‘যোগ্য’ মনে করা ও যাকে ‘সব সময় ভয় পেয়ে এসেছে’ সেই মানুষটির অভিব্যাক্তি বুঝবার জন্যই ছিলো সেই ফোন কল।
এই ফোন পেয়ে জিয়া টেলিফোনের ওপাশ থেকে ‘ওকে শফিউল্লাহ, গুড বাই’ বলে ফোন রেখে দেন। [সূত্র-৩]
বন্ধু শফিউল্লাহকে ‘অভিনন্দন’, ‘ধন্যবাদ’, ‘ওয়েল ডান’ কোনো শব্দেই জিয়া ভূষিত করেনি। ঠিক আছে বলে ফোন রেখে দেয়া আমার দৃষ্টিতে এক ধরনের উগ্রতার/রুড বিহেইভিয়ার-এর পরিচায়ক এবং পরিষ্কারভাবে জিয়া যে ক্রোধান্বিত ছিলো সেটির স্পস্ট ইঙিত আমাদের জানিয়ে যায়।
জিয়া সেনাপ্রধান হতে চেয়েছিলো-
জিয়া সেনাপ্রধান হতে চেয়েছিলো এই ধারনাটি আজকে ২০২২ সালে এসে আমার পঠিত প্রতিটি তৎকালীন সময়ের গ্রন্থ, লিখিত ইতিহাস সু-স্পস্টভাবে সাক্ষ্য দেয়।
জিয়াকে সেনাপ্রধান ‘না করে’ বঙ্গবন্ধু সরকার শফিউল্লাহকে কেন সেনপ্রধান বানিয়েছেন এই ব্যাপারটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর এত বেশী পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যায় যেটিতে আর পরবর্তী প্রশ্নও করতে হয় না। তবে বঙ্গবন্ধু সরকার জিয়াকে প্রধানের কাছেই রেখেছিলেন। নতুন পদ তৈরী করে রেখেছিলেন 'ডেপুটি চীফ' হিসেবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই যে আমি ‘না করে’ শব্দটা ব্যবহার করেছি এটিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদোন্নতি’র ক্ষেত্রে সরকারের কোনো দায়কে কি ইঙ্গিত করে?
অর্থ্যাৎ বঙ্গবন্ধু সরকার কি বাধ্য ছিলেন অমুক কে সেনাপ্রধান করতে হবে এই এই ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতঃ কিংবা এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম কি আসলে ছিলো? আমার জানা মতে; ছিলোনা।
আর যদি থাকেও তাহলে জিয়া আর শফিউল্লাহর ক্ষেত্রে দুইজনের পজিশন, অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধকালীন হিসেব-নিকেশ একই রকম বলা যেতে পারে। ফলে বঙ্গবন্ধু সরকারের সামনে নানাবিধ অপশনের মধ্যে শফিউল্লাহকে বেছে নেয়াটা আইনী, কনভেনশনাল কোনোদিকেই অন্যায় ছিলোনা।
শফিউল্লাহর উল্লেখিত জবানবন্দীতেই আমরা স্পস্ট দেখতে পাই জিয়া নানাভাবে শফিউল্লাহকে তার পদে অযোগ্য দেখাবার জন্য বঙ্গবন্ধুর কান ভারী করে যাচ্ছিলো।
এটি যেমন শফিউল্লাহ তার জবানীতে আমাদের জানাচ্ছেন যে তিনি তা শুনেছেন একইভাবে সরাসরি সোর্স উল্লেখ করে শফিউল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে খোদ বঙ্গবন্ধু তাঁকে এসে এই কথা বলেছেন। [সূত্র-৪]।
শফিউল্লাহ ১৯৭৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে যখন সেনাপ্রধান নির্বাচিত হলো, জিয়ার ক্রোধ আরো প্রবলভাবে বেড়ে যায় এবং জিয়া শুরু থেকেই মনে করে শফিউল্লাহর থেকে জিয়া অনেক বেশী ‘বেটার’ সেনাপ্রধান পদটির জন্য।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে জিয়ার ছায়া-
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আরেক সাক্ষী কর্ণেল শাফায়াত জামিল তার নিজের জবানবন্দীতে তো জিয়ার ভূমিকা বলেনই উপরন্তু শফিউল্লাহর জবানবন্দীতেও আমরা দেখতে পাই তিনি (জামিল) শফিউল্লাহকে এসে বলেছেন যে, যা কিছু ঘটে গেছে বা ঘটছে, তার পুরোটার পেছনে রয়েছে ‘ডেপুটি চীফ’ অর্থ্যাৎ জিয়া। [সূত্র-৫]
জিয়া সেনাবাহিনীতে প্রাক ১৫-ই অগাস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত ছিলেন একজন অসম্ভব রকমের ‘মিচকা শয়তান’ এবং খুনের পরিকল্পনাকারী।
তলে তলে বঙ্গবন্ধুর খুনীদেরকে পরামর্শ দেয়া, রাস্তা দেখিয়ে নানাভাবে সাহায্য করা এগুলো ছাড়াও তার একটা প্রধান কাজ ছিলো ‘চোগলখুরি’ করা। এটি একটা প্রচলিত বাংলা শব্দ। অনেকেই বুঝবেন সে কারনেই ব্যবহার করেছি।
অনেকেই জানবেন এবং স্বীকার করবেন যে একটা কাজের মধ্যে বা অফিসে এমন দুই একজন থাকেন যাদের কাজই হচ্ছে এক কলিগের সাথে আরেক কলিগের প্যাঁচ লাগানো, বসের কাছে গিয়ে অন্য কলিগের নামে দূর্নাম রটানো এই জাতীয়। জিয়ার চরিত্র ছিলো একেবারেই তেমন।
সে সময়ে নানা কারনে সেনাবাহিনী থেকে যত সেনা অফিসারের চাকুরী গিয়েছে এবং যতগুলো অফিসারকে নিয়ে সমস্যা তৈরী হয়েছে কোনো এক অদ্ভুত কারনে আমরা দেখতে পাই জিয়ার কাছেই সেসব অফিসাররা কোননা কোনো ভাবে আশ্রয় পেয়েছে এবং তার সাথেই যোগাযোগ রেখেছে।
আমরা এই কথার সত্যতা পাবো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় জিয়ারই খুব বিশ্বস্ত বন্ধু লে কর্ণেল আব্দুল হামিদ সাহেবের জবানীতে। (ফুটবলার কায়সার হামিদের বাবা)।
হামিদ সাহেব এই মামলার নবম সাক্ষী ছিলেন। তিনি তার জবানবন্দীতে পরিষ্কার করে আমাদের জানান যে, ১৪-ই অগাস্টের বিকেলে হামিদ সাহেব তাঁর বন্ধু জিয়া, কর্ণেল খুরশিদ ও কর্ণেল মামুনের সাথে লন টেনিস খেলবার সময় টেনিস কোর্টের আসে পাশে বঙ্গবন্ধুর খুনী নুর-ডালিমদের ঘোরাঘুরি করতে দেখেন।
এরও আগে এই চাকুরীচ্যুত অফিসারদের এখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখে চীফ শফিউল্লাহর নির্দেশে নূর-ডালিমদের এখানে আসতে নিষেধ করতে গিয়েই তিনি জানতে পারেন জিয়ার সাথে দেখা করতে ও তার অনুমতি নিয়েই নূর ও ডালিম এই টেনিস কোর্টে আসা-যাওয়া করছে। [সূত্র-৬]
একই সাথে এই অংশে আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ হওয়া গোপনীয় মার্কিন নথির রেশ ধরে।
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গবন্ধুর খুনী ফারুক রহমান মার্কিন এম্বেসিতে যান এবং ১৯৭৩ সালের ১১-ই জুলাই আরেক খুনী মেজর রশীদও আকষ্মিকভাবে মার্কিন দূতাবাসে যান জিয়াউর রহমানের পক্ষে।
সেই সময় ‘আরমামেন্টস প্রকিউরমেন্ট কমিটি’ নামে সেনাবাহিনীতে একটি কমিটি গঠিত হয় যার প্রধান ছিলো জিয়া।
অবমুক্ত হওয়া মার্কিন নথিতে পরিষ্কারভাবে ফারুক ও রশীদের জিয়ার পক্ষে এই দূতাবাসে যাওয়া এবং অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে মার্কিন পলিসি জানবার আলাপ আমরা জানতে পারি। এই বিষয়ে মার্কিন নথিতে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে নিউবেরি, ক্লিভ ফুলার্স প্রমুখদের পত্র-চালাচালি দেখে।
বিশেষ করে রশীদ মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিভাগের কর্মকর্তার সাথে যে অস্ত্র সরবরাহের কথা বা যেসব অস্ত্র মার্কিনিদের কাছে চান তার মধ্যে রয়েছে ১০৫ থেকে ১৫৫ মিলিমিটার কামান ও হালকা বিমান বিধ্বংসী কামান।
এই ঘটনার পর অর্থ্যাৎ রশীদের ১১ জুলাই ১৯৭৩ সালের মার্কিন দূতাবাসের গমনের পর ১২-ই জুলাই ১৯৭৩-এ ফারুক রহমানও পুনরায় মার্কিন দূতাবাসে যান এমং নিজেকে 'আর্মার্ড কোরের প্রধান' হিসেবে পরিচয় দেন।
তিনি আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার, হালকা ট্যাংক ও আম্ফিভিয়াস বা উভজান সরবরাহের বিষয়ে কথা বলেন। মাথায় রাখতে হবে এই দুই খুনী ভায়রাভাই কিন্তু একজনের কথাই সেখানে গিয়ে বলেন, আর তার নাম হচ্ছে জিয়াউর রহমান। [সূত্র-৭]
এখানে আরেকটি তথ্য জরুরি। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনী মেজর ডালিম বঙ্গবন্ধুকে ঘরোয়া পরিবেশে ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করতো এবং জিয়াকে ‘বস’ বলে। জিয়াকে আর্মি চিফ না করবার কারনে ডালিম তার লিখিত বই ‘যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি’তে তার সমস্ত ক্রোধ উগড়ে দেন। [সূত্র-৮]।
ডালিমের এই একই বই থেকে আমরা জানতে পারি ডালিম বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে জিয়াকে চীফ করবার জন্য ক্রমাগত অনুরোধ করতে থাকেন এবং বঙ্গবন্ধু এই সময়ই জানান যে জেনারেল ওসমানীর পরামর্শেই জিয়াকে চীফ করা হয়নি [সূত্র-৯]
একইভাবে জিয়াকে যখন ডিফেন্স এটাচে হিসেবে বার্মায় পাঠাবার কথা হচ্ছিলো সেই সময় ডালিম নিজে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে বারবার অনুরোধ করতে থাকে যে জিয়াকে যেন কোনোভাবেই বার্মায় পাঠানো না হয়। এবং ডালিম জানাচ্ছে সেদিন তার অনুরোধের প্রেক্ষিতেই জিয়ার বার্মা ট্রান্সফার আর হয়নি।
ডালিম বঙ্গবন্ধুর বাসায় সেদিন যখন যায় শেখ কামালের সাথে ঘটনা চক্রে তার সাথে দেখা হয়। কথার এক প্রসঙ্গে যখন কামাল হাসির ছলে বলেন 'আপনি আব্বার সাথে খালি ঝগড়া করেন', তখন ডালিম জবাব দেয় যে, সে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে বলেই দাবী নিয়ে কথা বলে। [সূত্র-১০]
বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার কথা বলা একদিকে আর অন্যদিকে জিয়ার সাথে গোপনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মিশন সাজানোর অংশ হিসেবে তাকে বার্মায় ট্রান্সফার বন্ধ করা তাও খোদ বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে, ইতিহাসে এইসব নির্মম প্রতারনা, এইসব সমস্ত বেঈমানী লেখা থাকবে।
আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, ডালিম নিজের হাতেই যেই বই লিখেছে, সেই বইতেই ডালিমের চরিত্র ডালিম নিজেই উন্মোচন করেছে। সাথে জিয়ারও।
জিয়াকে শুধু ডালিমই ‘বস’ ডাকতো না, ডাকতো আরেক খুনী নূরও।
জিয়া যে গোপন আলাপ হলেই নূর-ডালিম গংদের বাসায় ডাকতো সেটাও জানা যায় ডালিমের গ্রন্থে এবং বার্মায় ট্রান্সফারের পুরো বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য জিয়া বঙ্গবন্ধুর দুই খুনীকে ডেকে নিয়ে যান বাসায়। [সূত্র-১১]
অবশেষে জিয়ার ‘সেনাপ্রধান’ মুকুট লাভ-
বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে ঠিক ৯ দিন পর শফিউল্লাহকে সরিয়ে দিয়ে জিয়া সেনাপ্রধান হয়। তার দীর্ঘদিনের কাংখিত পদ যেটির জন্য জিয়া এমন কোনো ষড়যন্ত্র নেই যেটি করেনি, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটি করেননি।
জিয়া যখন তার এই পদোন্নতির জন্য খুনী মোশতাকের কাছ থেকে অফিসিয়াল পত্রটি পান সে সময়ে যে কয়েকজনের সাথে শুরুতেই জিয়া তার উল্লাস প্রকাশ করেন তাদের একজন জিয়ার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্ণেল আব্দুল হামিদ পি এস সি। শফিউল্লাহকে তখনও জানানো হয়নি। সরকারি চিঠি জিয়ার হাতে এবং তাতে জিয়া তার উল্লাস কোনোভাবেই দমিয়ে রাখতে পারছিলোনা।
হামিদকে দেখেই জিয়া ডাঁট মেরে গর্জে উঠলো, ‘Salute properly you guffy, you are entering chief of staff’s office’. [সূত্র-১২]
হামিদকে এও নির্দেশ দেয়া হলো যাতে পরদিন সকালে সমস্ত জওয়ানকে একত্রিত করা হয় কারন জিয়া তাদের প্রতি নির্দেশ দেবে। জওয়ানরা জড়ো হলে জিয়া চিৎকার করে মঞ্চ থেকে বলে উঠে, ‘আজ থেকে আমি চীফ অফ স্টাফ। আপনারা সবাই আপনাদের ডিসিপ্লিন ঠিক করেন, তা না হলে কঠোর শাস্তি হবে’ এই বলেই জিয়া মঞ্চ থেকে নেমে পড়ে।
হামিদ সাহেব জিয়ার সাথে অফিসে গিয়ে বসতেই অবাক হয়ে জিয়াকে জিজ্ঞেস করেন যে এতটা বাজেভাবে চড়াগলায় কথাগুলো না বললেই হতো না? জবাবে জিয়া বলেন, ‘শাট আপ। এটা তো কেবল শুরু। দেখনা আমি কিভাবে সব ব্যাটাকে ডিসিপ্লিন শিখিয়ে দেই’ [সূত্র-১৩]
জিয়া ‘সব ব্যাটাকে’ শুধু নয় পুরো দেশকেই এক গভীর অন্ধকারের শিক্ষা দিয়ে গেছেন আসলে।
এই প্রসঙ্গে আরো একটি সূত্রের বক্তব্য দেয়া যেতে পারে। জিয়া তার নিহত হবার ঠিক একদিন আগে চট্টগ্রামে আসেন এবং রাস্তার বেহাল অবস্থা দেখে গাড়িতে থাকা চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীকে অত্যন্ত রাগত কন্ঠে জানিয়ে দেন ‘Bangladeshis need to learn discipline’ [সূত্র-১৪]।
রক্ত-স্রোতের পথে জিয়া-
ঐ যে জিয়ার সেই শফিউল্লাহর পেছনে ‘চোগলখুরি’ করা থেকে শুরু তারপর একে একে জিয়া খুন করে তারই সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্ণেল তাহেরকে কোর্ট মার্শালের নামে।
যে তাহের ১৯৭৫ সালের ৭-ই নভেম্বর জিয়াকে বাঁচিয়ে এনে নতুন জীবন দিলেন সেই তাহেরকে খুন করেই জিয়া তার সামনের রাস্তা আরো প্রশস্ত করতে চাইলেন এবং নিজের সত্যকারের 'জাত' চেনালেন।
বঙ্গবন্ধুর খুনের মদতদাতা ও অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে নিজেকে ন্যস্ত রেখে প্রাথমিকভাবে হাত পাকানো এবং তার কিছুদিনের ভেতরেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্ণেল তাহেরকে বিচারের নামে খুন এই দুই ঘটনায় জিয়া ততদিনে খুন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ হয়েছে। তার সামনে থেকে আস্তে আস্তে দূর হয়েছে নানান বাঁধা। এইবার ক্ষমতায় যাবার পালা।
১৯৭৫ এর ৭-ই নভেম্বরের পর বিচারপতি সায়েমের হাতে ক্ষমতার গল্পটা মূলত আসলে গল্পই। পেছন থেকে সমস্ত কলকাঠি জিয়াই নেড়ে যাচ্ছিলো এবং সে সময়ের কেবিনেটে থাকা বেসরকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করে জিয়ার কাছে ক্ষমতা ন্যস্ত করে সায়েমকে পদত্যাগে বাধ্য করে [সূত্র-১৫]
জিয়ার এই যে এমন এক ক্ষমতার দিকে যাত্রা সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসকে বারবার বদলাতে বদলাতে গিয়েছে। জিয়া কিংবা জিয়ার সমর্থকেরা বার বার বলে এসেছে ‘সময়ের প্রয়োজনে’ কিংবা ‘জাতির কঠিন বা নাজুক সময়ের’ মুহূর্তে জিয়া ক্ষমতা দখল করেছে।
আসলে কি ব্যাপারটা এতটাই সরল? উত্তর হচ্ছে, না। সেই যে জিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান হবার জন্য ছিঁচকে ‘চোগলখুরি’ দিয়ে তার জীবন শুরু করেছিলেন, সেই যাত্রা এসে ঠেকেছিলো হত্যার মহাউৎসবের মধ্য দিয়েই।
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরপর একটি নির্বাচিত সরকারকে সরাবার এই যে দীর্ঘ ষড়যন্ত্র এবং সেটি হত্যা কিংবা অভ্যুত্থান ‘যে কোনো মাধ্যমে হলেই হবে’, এই যে এমন একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা এটি আজকের দিনে এসে এতবেশী স্পস্ট হয়ে ওঠে যা পড়ে ও বুঝে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়।
যে ইতিহাস অনেকের কাছেই দূর্বোধ্য এবং দ্বিধার, আমার কাছে সে ইতিহাস একেবারেই জলবৎ তরলং। মনে হচ্ছে একটি গা শিরশির করা চলচ্চিত্র আমার চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে ক্রমাগত। কথায় আছে কচুগাছ কাটতে কাটতে মানুষের গলা কাটা শিখে যায় ব্যাক্তি। জিয়ার ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে।
১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরে বিমানবাহিনীতে ক্যু কে কেন্দ্র করে জিয়া রীতিমত তার নিষ্ঠুরতার সীমানাকে সকলের সামনে চিহ্নিত করে দেয়।
আমার কাছে যা নথি-পত্র রয়েছে তাতে করে আমি এখনই হিসেব করে বলে দিতে পারি এই সময় ২১৭ জন সামরিক কর্মকর্তাদের ফাঁসী দেয় জিয়া। [সূত্র-১৬]।
কিন্তু আরো অসংখ্য তথ্য ও ভিকটিমদের মাধ্যমে জানা যায় যে এই ফাঁসীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের কাছাকাছি।
জিয়ার বিরুদ্ধে ক্যু এবং ক্যু-এর পরিকল্পনা-
এই যে জিয়া এমন হত্যা আর রক্তস্রোতের মত হেঁটে যাচ্ছে, ঠিক তারই মধ্যে দিয়ে কিন্তু তার হন্তারক তৈরী হয়ে গেছে। সেটা জিয়া জানতো বলেই ইতিহাস আমাদের সাক্ষ্য দেয়।
৭৫ থেকে ৮১ সময়কে, মানে জিয়ার মৃত্যর আগ পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে এবং সমস্ত বই-পত্র-নথি পড়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে জিয়ার বিরুদ্ধে আসা সমস্ত ক্যু-কে [প্রায় ১৭ বা ১৯] জিয়া অত্যন্ত নির্মমভাবে দমিয়ে দিতে পেরেছিলেন। [সূত্র-১৭], [সূত্র-১৮]
যেমন, বঙ্গবন্ধুর যেই খুনীদের জিয়া সাহায্য-সহযোগিতা করলেন, দেশের বাইরে চাকুরী জোগার করে দিলেন সেই খুনীদের দুইজন রশীদ-ফারুক-মোসলেইউদ্দিনরা মিলে ১৯৭৬ সালের এপ্রিলেই জিয়াকে খুনের জন্য রীতিমত সমস্ত পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেন।
এই পরিকল্পনার একেবারেই পুরোটাজুড়েই ছিলো ফারুক ও রশীদ। এমনকি এই এপ্রিলের আগে জিয়ার পাঠানো দূত নূরুল ইসলাম ওরফে শিশুর মাধ্যমে রশীদের সাথে লিবিয়ার বেনগাজীতে বৈঠক আয়োজন করে জিয়া। রশীদ দেশে ফিরতে চায় কিন্তু জিয়া দিতে চায়না।
অনেক অনুনয় বিনয়ের পর জিয়া আলোচনার জন্য শুধু রশীদকে দেশেয়াসবার অনুমতি দেয়। রশীদ, জিয়ার আনুগত্য মেনে নিয়েছে এই মর্মে একটা দীর্ঘ চিঠিও লিখে ফেলে। [সূত্র-১৯]
রশীদ ও জিয়া দুইজনই খুনী। কিন্তু যখন এই দুই খুনীদের একজন আবার আরেক খুনীকে হত্যা করবার পরিকল্পনা করে এবং যখন এটি আমাদের সামনে আসে তখন বিষ্ময়ে শুধু এসব পড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা।
পরে অবশ্য এই হত্যা পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। বেঁচে যায় জিয়া।
কিন্তু ১৯৭৬ সালেই খুনের শিকার থেকে বেঁচে যাওয়া জিয়া পদে পদে শত্রু তৈরী করতে থাকে তার হেঁটে আসা রক্তাক্ত পথে। সবাইকে ঠেকাতে পারলেও ঠেকাতে পারেনা কর্ণেল মঞ্জুর আর তার সাথে থাকা অফিসারদের।
১৯৮০ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর, ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আর ঐ একই বছরের ১০-ই মে জিয়ার বিরুদ্ধে ক্যু করবার পরিকল্পনা করা হয়। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারীর ক্যু পরিকল্পনার পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিলো সেটি আমরা জানতে পারি। উদ্দেশ্যগুলো ছিলো জিয়াকে জিম্মি করে ৬ টি দাবী পূরন করবে জেনারেল মঞ্জুরের অফিসাররা।
দাবীগুলো হচ্ছে-
(১) সেনা প্রধান এরশাদ, ৯ম ডিভিশনের জিওসি শওকত, মেজর জেনারেল আমজাদ, মেজর জেনারেল আমিন সহ কয়েকজনকে বরখাস্ত করা (২) শাসনতন্ত্র বাতিল করে বিপ্লবী সরকার গঠন করে দেশ চালানো (৩) ৩ বছর রাজনীতি বা নির্বাচনী কার্যকলাপ বন্ধ রাখা (৪) সেনাবাহিনীর পদোন্নতির ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি হবে যোগ্যতা (৫) আইন-শৃংখলার উন্নতি সাধন (৬) সামাজিক ন্যাবিচার প্রতিষ্ঠা ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা দূর করা [সূত্র-২০]
শেষ পর্যন্ত জিয়ার অবধারিত মৃত্যু-
এই যে উপরে জিয়াকে জিম্মি করে রাখার প্ল্যান এবং ৭ টি দাবী, এর প্রত্যেকটিই আসলে আলাদা করে আলোচনার দাবী রাখে। উপরের দাবি-দাওয়াগুলো দেখেই বুঝতে পারা যায় কোনটা কার দাবী, কেন দাবী। যেমন প্রথম দাবী দেখেই বুঝতে পারা যায় এটি ছিলো মঞ্জুরের নিজস্ব দাবী।
কেননা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সেই সময় এরশাদ, জি ও সি শওকতের সাথে মঞ্জুরের ভয়াবহ সমস্যা চলছিলো।
জিয়া চট্টগ্রামে পৌঁছুলে বিমানবন্দরে মঞ্জুরকে আসতে নিষেধ করা, জিয়া চট্টগ্রামে মঞ্জুরকে ট্রান্সফার করা এমন অনেক বিষয় জিয়ার সাথে মঞ্জুরের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়েছিলো আর মঞ্জুর ধীরে ধীরে জিয়ার প্রতি ক্রুদ্ধ হতে থাকে। [সূত্র-২১]
জিয়া আর মঞ্জুরের সম্পর্ক ছিলো খুবই মধুর। এই তথ্য যেমন আমরা পাই মঞ্জুরের বাবার বয়ানে [সূত্র-২২]
তেমনি আমরা পাই চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিনের বয়ানেও। তাঁর ভাষায়-Manzoor and Zia had been friends for decades, and I personally witnessed how Manzoor rallied the country side along with Zia to buttress support for him after Zia ascendant to power in 1975. [সূত্র-২৩]
কিন্তু এটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক নির্মম পরিহাস যে খুব কাছের মানুষের হাতেই একে একে প্রাণ দিয়েছে কিংবা প্রতারণা বা বিট্রেয়ালের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন তারা। তবে এই ক্ষেত্রে জিয়ার ব্যাপার অন্যদের থেকে আলাদা।
জিয়া যেমন হত্যার পর হত্যা করে এক নির্মম রাস্তা তৈরী করে সেই রক্তাক্ত পথে হেঁটে যাচ্ছিলো সেখানে এই হত্যার শিকার হওয়াটা ছিলো জিয়ার একেবারে অবধারিত।
কারো ভাষ্যে ১৭ কিংবা কারো ভাষ্যে ১৯ টি ক্যু এড়িয়ে জিয়াকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা যখন প্রায় শেষ, সেইদিনে জিয়া টানা দেড়ঘন্টার বক্তৃতা করলেন সুধী সমাবেশে, উপ প্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিন ও ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরীর মধ্যকার রেশারেশি নিরসনের চেষ্টা করলেন, করলেন চট্টগ্রামের ড্রাই ডক উদ্বোধন ইত্যাদি। [সূত্র-২৪]
অথচ জিয়া এয়ারপোর্টে নেমেই যেই মঞ্জুরের কথা জিজ্ঞেস করলেন এবং তাকে টেনিস কম খেলতে বলে মজা করলেন সেই মঞ্জুরই সেদিনের দিবাগত রাতে গ্রেফতারের উদ্দেশে লোক পাঠাবে, এটা ঘুনাক্ষরেও কেউ জানতে পারেনি। [সূত্র-২৬]
হত্যার চূড়ান্ত মুহুর্ত-
রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনটা পিক-আপ চলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের দিকে। সেখানে উঠে বসেছে ১৬ জন সেনাবাহিনীর অফিসার। দায়িত্বে তিনটি গ্রুপ। প্রথম গ্রুপে লে কর্ণেল মাহবুব, লে কর্ণেল ফজলে হুসেইন, মেজর খালেদ সহ ৬ জন। ২য় গ্রুপেও ৬ জন। এই দলে রয়েছেন লে কর্ণেল মতি, মেজর মোমিনুল। ৩য় টিতে মেজর ফজলুল হক, মেজর গিয়াস উদ্দিন প্রমুখ।
এই ৩য় গ্রুপটিকে বলা হয়েছে তারা যাতে সার্কিট হাউসের দিকে না যায় বরং আলমাস সিনেমা হলের সামনে যাতে অপেক্ষা করে।
প্রথম গ্রুপ সার্কিট হাউসে ঢুকে গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসের দোতলায় এটাক করবে। ২য় গ্রুপ সার্কিট হাউসের গ্রাউন্ড নিরাপদ রাখবে আর ৩য় গ্রুপ লক্ষ্য রাখবে যাতে কেউ এই সার্কিট হাউস থেকে পালিয়ে না যেতে পারে।
১ ও ২ নাম্বার গ্রুপ চট্রগ্রাম ক্লাবকে বাঁয়ে রেখে দেওয়ানহাট ব্রিজ ঘুরে সি এন্ড বি রোড হয়ে সার্কিট হাউজের দিকে এগিয়ে যায়।
দুইটি পিক-আপ ঢুকে যায় সার্কিট হাউসের ভেতরে। প্রথম পিক-আপে রকেট লাঞ্চার ছিলো। সার্কিট হাউস লক্ষ্য করে জওয়ানরা তা ছোঁড়ে।
সার্কিট হাউসে থাকা গার্ডেরা অস্ত্র নিয়ে প্রতিহত করবার চেষ্টা করে।
প্রথম দল এস এম জি দিয়ে একনাগাড়ে ফায়ার করতে করতে উঠে যায় সার্কিট হাউসের দোতলায়। কিছু বুঝে উঠবার আগেই প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট ও পুলিশের ৮ থেকে ১০ জনের দেহ ঝাঁজরা হয়ে গেলো।
এইবার দ্বিতীয় দলও গুলি বর্ষন শুরু করেছে। উঠে গেছে দোতলায়। জিয়া ছিলেন সার্কিট হাউজের ৪ নাম্বার ঘরে কিন্তু অফিসারদের কাছে তথ্য ছিলো জিয়া ৯ নাম্বার ঘরে রয়েছেন। কিন্তু আদতে দেখা গেলো সে ঘরে ডাক্তার আমেনা রয়েছেন।
এত গোলাগোলির শব্দ শুনে ৪ নাম্বার কক্ষে অবস্থানরত জিয়া সিঁড়িড় ডান দিকের কক্ষের দরজার পাল্লা একটু ফাঁকা করে দেখার চেষ্টা করলেন। এই ঘরের দুটি দরজা। অনেকের মতে জিয়া সিড়ি দিয়ে ছাদে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন।
জিয়াকে হত্যা করবার নির্দেশ বোধকরি ছিলোনা। তাকে গ্রেফতারের জন্য নির্দেশ প্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট মোসলেউদ্দিন জিয়াকে দেখে কিছুটা হকচকিত হয়ে পড়ে। সেই মুহুর্তে ২য় গ্রুপের লে কর্ণেল মতি আকষ্মিকভাবে সেখানে এসে পড়ে।
ভেতরের সমস্ত রাগ-ক্ষোভ-ক্রোধ যেন মতির ভেতরে একাকার। জিয়ার মুখ উপরে তুলে তার উপর একটি পুরো ম্যাগ্যাজিন চালিয়ে দেন লেফটন্যান্ট কর্ণেল মতি।
মাঝে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। সারা রাত পড়ে ছিলো জিয়ার লাশ। সকাল প্রায় সাড়ে ৯ বা ১০ টার দিকে মঞ্জুরের লোকেরা এসে লাশ নিয়ে যায়। সকাল ১০ টার দিকে মেজর মোজাফফর চলে যান সার্কিট হাউসে। একটা আধখোলা দরজার ভেতরে পড়ে আছে জিয়া।
কর্ণেল মতিউর মেজর মোজাফফরকে বললেন, রাঙ্গামাটির দিকে কনো এক পাহাড় থেকে জিয়ার মৃতদেহ নীচে ফেলে দেবার জন্য। খানিকটা ইতস্তত করেছিলেন মেজর মোজাফফর। কর্ণেল মতি বললেন, 'জিয়াকে কবর দিয়ে আমরা তাকে জাতীয় বীর তৈরী করতে চাইনা। সুতরাং যেভাবে বলছি সেভাবেই করুন'
মেজর সাহেব বিছানার চাদর টেনে নিলেন। কয়েকজন সিপাইয়ের সহায়তায় লাশ চাদর দিয়ে জড়িয়ে নিলেন। পাহাড় থেকে ফেলে দেবার বিষয়টা মোজাফফরের ভেতরে সায় দেয়নি।
কাপ্তাই রোডের পাথরঘাটা নামের এক ছোট্ট গ্রাম। এক টুকরো সমতল ভূমির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো খেজুর গাছ দেখলেন মেজর। ডেকে আনলেন স্থানীয় মাদ্রাসার একজন ইমামকে। ভাবলেন এই খেজুর গাছটাই কবরের নিশানা হিসেবে কাজ করবে। উল্লেখ্য যে মোজাফফর একই সাথে আরো দুইজন ব্যাক্তির লাশ নিয়ে এসেছিলেন জিয়ার সাথে সাথে সার্কিট হাউস থেকে।
ইমামকে বলা হোলো শান্তি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন সামরিক বাহিনীর তিনজন অফিসার। জানাজা পড়ানো হোলো। একটা কবর খুঁড়ে দাফন করা হলো জিয়া সহ বাকি দুইজনের লাশও। [সূত্র-২৭]
এই পর্যন্ত এসে থেমে যেতে হচ্ছে। এখান থেকে লিখতে গেলে চলে আসবে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকান্ডের ইতিহাস। আজকের লেখায় আর সেদিকে যাবোনা। তবে শুধু মঞ্জুর হত্যাকান্ড নিয়েই লিখবো আরেকটি পূর্ণাঙ্গ লেখা।
জানিয়ে রাখি এই হত্যাকান্ডের পরপর বিচার বহির্ভূতভাবে মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে থানা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের সেনাবাহিনীর একদল সদস্যরা খুন করে তাঁকে। সাথে মেজর মতি ও মেজর মঞ্জুরের ভাগনে ব্রিগেডিয়ার মাহবুবুরকে।
পরবর্তীতে কোর্ট মার্শাল গঠন করা হলে এক প্রহসনের বিচার অনুষ্ঠিত হয় যার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে রিট হয়, রিট খারিজ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ১৩ জন সেনা অফিসারদের এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় আরো ১০ জন সেনা অফিসারের। [সূত্র-২৮]
বিভিন্ন সূত্র ধরেই বলা হয় মঞ্জুর এবং আরো বাকি দুইজনকে এভাবে তড়িঘড়ি করে খুন করা, বিচারের মুখোমুখি না করা, ১৩ জন সেনা অফিসারকে দ্রুততার সাথে ফাঁসী এসব কিছুই সন্দেহজনক কার্যকলাপের অংশ।
খালেদা জিয়ার আমলেই ১৯৯৫ সালে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানাতে নিজে বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন যার প্রধান আসামী ছিলো মেজর এমদাদ যিনি মঞ্জুরকে তৎকালীন সময়ে থানা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যান। [সূত্র-২৯]
এই মঞ্জুর হত্যা মামলা আজও নিষ্পত্তি হয়নি এবং এটিকে কেন্দ্র করে এরশাদের দিকে বার আঙ্গুল উঠেছে। এই প্রসঙ্গে এয়ারভাইস মার্শাল সদরুদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছিলেন এরশাদ ও সদরুদ্দিন।
নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম এ খান তখনো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছুতে পারেন নি। এমন সময় পুলিশের আইজি উপস্থিত হয়ে মঞ্জুরের ধৃত হবার খবর দেন। এতে এরশাদ স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠে সেনাবাহিনীর দসর দপ্তরে ফোন করে একজন জেনারেলকে নির্দেশ দেন, Go ahead with that plan. সদরুদ্দিন জিজ্ঞেস করলেন may I know what is that pan?
এতে এরশাদ রাগান্বিত স্বরে জবাব দিলেন, এয়ার চীফ আপনি ওসব বুঝবেন না। সদরুদ্দিন দৃড়ভাবে জবাব দিলেন, But Manzorr should not be killed, you will be answered to the whole nation.
এরপর ঐদিন মিটিং দ্রুত শেষ হয় এবং সদরুদ্দিন সাহেবের সাথে এরশাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এরশাদ কয়েকজন জেনারেলকে সাথে নিয়ে মঞ্জুরকে হত্যা করবার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরদিন সকালে রেডিওতে বলা হয় কয়েকজন উচ্ছৃংখল সৈনিক মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করে।
এই খবর পেয়ে এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিন এরশাদকে ফোনে বলেন, আপনারা মঞ্জুরকে মেরেই ফেললেন? এরশাদ সদরুদ্দিন সাহেবকে নানাভাবে বুঝাবার চেষ্টা করলে সদরুদ্দিন সাহেব এরশাদকে বলেন,
এই গল্প অন্য কাউকে বলুন, At least don’t ask me to believe it’ [সূত্র-৩০]
*****************************
সূত্র-১ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-সাক্ষীদের জেরা, পৃষ্ঠা-৩১১, আবুল হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত, মীরা প্রকাশনী
সূত্র-২ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-সাক্ষীদের জেরা, পৃষ্ঠা-৩১২, আবুল হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত, মীরা প্রকাশনী
সূত্র-৩ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-সাক্ষীদের জেরা, পৃষ্ঠা-৩১২, আবুল হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত, মীরা প্রকাশনী
সূত্র-৪ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-সাক্ষীদের জেরা, পৃষ্ঠা-৩১৩, আবুল হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত, মীরা প্রকাশনী
সূত্র-৫ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-সাক্ষীদের জেরা, পৃষ্ঠা-৩১৭, আবুল হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত, মীরা প্রকাশনী
সূত্র-৬ –বঙ্গবন্ধুর দ’টি ঐতিহাসিক মামলার জেরা ও জবানবন্দী, পৃষ্ঠা-১৩২, এডভোকেট সাহিদা বেগম, গতিধারা প্রকাশনী
সূত্র-৭ – মার্কিন দলিলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, পৃষ্ঠা-১৩-১৬, মিজানুর রহমান খান, প্রথমা প্রকাশনী
সূত্র-৮-‘যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি, পৃষ্ঠা-৪০৭, শরিফুল হক ডালিম, নব জাগরন প্রকাশনী
সূত্র-৯-‘যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি, পৃষ্ঠা- ৪১০ শরিফুল হক ডালিম, নব জাগরন প্রকাশনী
সূত্র-১০-যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি, পৃষ্ঠা-৪৩৫-৪৩৬, শরিফুল হক ডালিম, নব জাগরন প্রকাশনী
সূত্র-১১-যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি, পৃষ্ঠা-৪৩৩, শরিফুল হক ডালিম, নব জাগরন প্রকাশনী
সূত্র-১২-‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা’, পৃষ্ঠা-৬৩, মুনতাসীর মামুন, কথা প্রকাশ
সূত্র-১৩-‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা’, পৃষ্ঠা-৬৪, মুনতাসীর মামুন, কথা প্রকাশ
সূত্র-১৪-‘Assasination of Ziaur Rahman and the aftermath’, Page-17, Ziauddin M. Chowdhury, UPL
সূত্র-১৫, বঙ্গভভনে শেষ দিনগুলো, পৃষ্ঠা-৩৫, আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মাওলা ব্রাদার্স
সূত্র-১৬, রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪৭, জায়েদুল আহসান, চর্চা প্রকাশনী
সূত্র-১৭- সাপ্তাহিক রবিবার, ১৪-ই জুন ১৯৮১, পৃষ্ঠা-১২
সূত্র-১৮- মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড-দূর্যোধনটি কে?’, পৃষ্ঠা-২২, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ঐতিহ্য প্রকাশনী
সূত্র-১৯- Legacy of Blood, Page-138, Anthony Mascarenhas, Hodder & Stoughton Publication
সূত্র-২০- ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড-দূর্যোধনটি কে?’, পৃষ্ঠা-২৫, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ঐতিহ্য প্রকাশনী
সূত্র-২১- মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড-দূর্যোধনটি কে?’, পৃষ্ঠা-২৪-২৫, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ঐতিহ্য প্রকাশনী
সূত্র-২২- সাপ্তাহিক রবিবার, ১৪-ই জুন ১৯৮১, পৃষ্ঠা-১৭
সূত্র-২৩-‘Assasination of Ziaur Rahman and the aftermath’, Page-88, Ziauddin M. Chowdhury, UPL
সূত্র-২৪- মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড-দূর্যোধনটি কে?’, পৃষ্ঠা-২৩, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ঐতিহ্য প্রকাশনী
সূত্র-২৫- মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড-দূর্যোধনটি কে?’, পৃষ্ঠা-২৪-২৫, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ঐতিহ্য প্রকাশনী
সূত্র-২৬-‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা’, পৃষ্ঠা-৯০, মুনতাসীর মামুন, কথা প্রকাশ
সূত্র-২৭-বঙ্গবন্ধু, জিয়া, মঞ্জুর হত্যাকান্ড। জতু গৃহ এক্টিই', পৃষ্ঠা-৮৩-৮৫, মোঃ নূরুল আনোয়ার, ২০১৫, ঐতিহ্য
সূত্র-২৮-ফাঁসির মঞ্চে ১৩ জন, পৃষ্ঠা-১৮, আনোয়ার কবির, মাওলা প্রকাশনী
সূত্র-২৯-আজকের সূর্যোদয় ম্যাগাজিন, তারিখ-১৪-২০ মার্চ ১৯৯৫, পৃষ্ঠা-১০-১১,
সূত্র-৩০-সাপ্তাহিক বিচিত্রা ম্যাগাজিন, ২৩ বর্ষ ৪৪ সংখ্যা, ২৪ শে মার্চ ১৯৯৫, পৃষ্ঠা-২২
21/05/2026
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদারদের চরম দুর্দশা:
সম্পূর্ণ নিউজ দেখতে লিংক কমেন্টে
👇👇👇👇👇👇👇👇👇👇👇
17/05/2026
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি"**
* পদের নাম : সাব-এডিটর (Sub-Editor)
* পদ সংখ্যা: ২ জন*
* কাজের বিবরণ ও যোগ্যতা
* অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
* দ্রুত ও নির্ভুল বাংলা টাইপিং এবং সংবাদ সম্পাদনায় দক্ষতা।
* কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে ভালো জ্ঞান।
* বেতন ও সুযোগ-সুবিধা:
* বেতন: আলোচনা সাপেক্ষে
* আবেদন করার নিয়ম (নিচে স্পষ্ট করে):
আপনার সিভি (CV) ইমেইল করুন:[email protected]
সত্যের সন্ধানে... www.etimes24.com
ইটাইমস২৪.কম-এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি! 🌐
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'ইটাইমস২৪.কম'-এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২ জন দক্ষ ও গতিশীল **সাব-এডিটর (Sub-Editor)** নিয়োগ দেওয়া হবে। আপনি যদি সাংবাদিকতা পছন্দ করেন এবং সংবাদের জগতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে আজই আবেদন করুন।
📌 **পদের নাম: সাব-এডিটর
📌 **পদ সংখ্যা: ০২ জন
📝 **যোগ্যতা ও দায়িত্বসমূহ:**
* অনলাইন নিউজ পোর্টালে ডেস্কে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা (অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার)।
* দ্রুত ও নির্ভুল বাংলা টাইপিং এবং সাবলীল অনুবাদে পারদর্শিতা।
* ফিচার, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক ও সমসাময়িক বিষয়ে আকর্ষণীয় হেডলাইন ও সংবাদ লেখার দক্ষতা।
* ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিউজ শেয়ারিং সম্পর্কে ধারণা।
💰 বেতন:আলোচনা সাপেক্ষে।
📩 আবেদনের প্রক্রিয়া:
আগ্রহী প্রার্থীদের আগামী [25/5/2026]-এর মধ্যে বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত (CV) এবং সাম্প্রতিক কাজের নমুনাসহ ইমেইল করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
📧 ইমেইল করুন:[email protected]
সত্যের সন্ধানে সবসময়...
ইটাইমস২৪.কম এর সাথে থাকুন।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the business
Website
Address
DOHS, Mohakhali
Dhaka
1206