Easy Shop
12/06/2024
12/11/2023
#দায়িত্ব
একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে গাড়ি চালক হিসেবে টানা আট বছর দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে গেছি। অফিস বা বড় কর্তাদের প্রয়োজনে ছুটির দিন বা অনেক রাত পর্যন্তও ডিউটি করলাম, বিনা বাক্যে। স্বয়ং চেয়ারম্যান স্যারও কিন্তু আমার গাড়ি ড্রাইভিংয়ের প্রশংসা করেন। ঢাকার বাইরে স্যারের ট্রিপে ড্রাইভার হিসেবে আমি সবসময়ই প্রথম পছন্দের ছিলাম।
অথচ দেখুন করোনার প্রথম ছোবলে আমার চাকুরীটা চলে গেল। বড় স্যারদের কাছে গিয়ে কত কাকুতি মিনতি করলাম, অসুস্থ মায়ের কথা বললাম। তাতেও কারো মন গললো না। চাকুরি না থাকলে দুই শিশু বাচ্চা না খেয়ে থাকবে বলে চেয়ারম্যান স্যারের পা ধরেও কাঁদলাম। না, তবুও রক্ষা পেলাম না। সত্যি বলতে কি আর সবার মতো অফিসে আমার মামা চাচা নেই, তাইতো আমাকে ছাটাই করতে ওদের কোন সমস্যা হল না।
ছাটাই হওয়ার সময় অফিস থেকে পাওয়া বাইশ হাজার টাকা ছিল আমার শেষ সম্বল। বাড্ডার দুই রুমের একটা ছোট্র বাসার ভাড়া, অসুস্থ মায়ের ওষুধ খরচ, চার আর দেড় বছরের দুটো মেয়েকে ভালো মন্দ খাওয়াতে বেতনের টাকাতেই হিমশিম খেতে হত। তবে তখন আমার স্ত্রী কিভাবে যেন এসব ম্যানেজ করতো। তাইতো চাকুরী চলে যাওয়ার পর মাথায় বজ্রপাত। না খেয়ে থাকতে হবে এটা নিশ্চিত।
আজ ষোল বছর ধরে আমি গাড়ি চালাই, প্রথম আট বছর বাসা বাড়ির গাড়ির প্রাইভেট ড্রাইভার ছিলাম আর গত আট বছর ধরে কোম্পানির। তাইতো ড্রাইভিং ছাড়া অন্য কোন কাজ আর শেখা হয়ে উঠেনি। কত পরিচিত ড্রাইভার আর সাহেবদের সাথে যোগাযোগ করলাম, এমনকি অর্ধেক বেতনেও কেউ ড্রাইভিংয়ের চাকুরীর ব্যবস্হা করতে পারেনি।
এরই মধ্যে তিন চার জায়গায় চাকুরীর জন্য ইন্টারভিউ দিলাম। এমনকি ড্রাইভিং টেস্টও দিয়েছি। ইংরেজি ভালো জানি না, তারপরও সাহস করে এক আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্হায় ড্রাইভিংয়ের চাকুরীর একটা পরীক্ষাও দিলাম। রোড টেস্টে ভালো করলেও অনেক মোটা বেতনের ঐ চাকুরী কি আর আমাদের কপালে আছে। ইন্টারভিউ হয়েছে আজ দুমাস হল ওরা কিছুই জানায়নি, তাইতো আশা ছেড়ে দিলাম। এরকম অনেকেই পরীক্ষা নিয়ে শেষ পযর্ন্ত আমাকে আর চাকুরী দেয়নি।
দু মাস বাসায় বসে থাকার পর বাড়ি ভাড়া বকেয়া পড়তেই টনক নড়লো। আমার এক পরিচিত ড্রাইভার বন্ধু যে কিনা এখন উবার চালায় তার সহায়তায় উবারের ড্রাইভার হয়ে গেলাম। করোনা পরিস্হিতিতে উবার ড্রাইভাররা যে কতো কষ্টে আছে তা এই লাইনে না আসলে জানতাম না। তারপরও পরিবারের কথা চিন্তা করে বলতে গেলে সারাক্ষণ গাড়ি নিয়ে আছি। বকেয়া দুমাসের বাসা ভাড়া, দোকান আর ফার্মেসীতে অনেক টাকা বাকি। সব মিলিয়ে অনেক টাকার দেনার চিন্তায় রাতে আমার ভালো ঘুম আসে না।
আজ সকালে গাড়ি নিয়ে বের হতেই নতুন বাজার থেকে এয়ারপোর্ট রেল স্টেশনের একটা ভাড়া পেলাম। যাত্রী নামিয়ে এয়ারপোর্ট স্টেশনে বসে আছি, পরবর্তী জবের জন্য। প্রায় ঘন্টা খানেক পর একটা ট্রেন আসতেই ভাড়া পেলাম পান্হপথের গ্রীনরোডে। গ্রীন লাইফ হসপিটালে। লম্বা পথ, ভালো এমাউন্টের এই ভাড়াটা পেয়ে মনটা ভালো হয়ে উঠলো।
প্যাসেঞ্জার দুজন। কথোপকথনে বুঝলাম জামালপুর থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গ্রামের এক যুবক অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত লোকটার অবস্হা শোচনীয় বলেই এরা আজ উবার ডেকেছে। নচেৎ লুঙ্গি পড়া বৃদ্ধের গাড়ি ভাড়ার সঙ্গতি যে নেই তা বেশ বোঝা যায়।
জ্যামের মধ্যে কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করতেই আমার ধারণাটাই সত্য হল। জামালপুর বা ময়মনসিংহে ভালো চিকিৎসা নেই বলেই অনেক কষ্ট করে এরা ঢাকায় এসেছে। লোকটার নাকি জীবন মরন অবস্হা, শীঘ্রই অপারেশন করতে হবে। প্রতিদিন কত রকমের প্যাসেঞ্জার দেখি তবে মরনাপন্ন রোগী দেখলে নিজের কাছেই অনেক খারাপ লাগে।
গ্রীন লাইফ হসপিটালের দারোয়ানরা এক মিনিটের বেশিও গাড়ি দাড়াতে দেয়নি। তাড়াহুড়ো করে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে গ্রীন রোড ধরে সাইন্স ল্যাব গেটে আসতেই ব্যাগটা চোখে পড়লো। যাত্রীর ফেলে যাওয়া ব্যাগ। দায়িত্ববোধ থেকেই উবারে দেওয়া যাত্রীর মোবাইল নাম্বারে কল দিতেই ফোনটা বন্ধ পেলাম। খানিকটা বিরক্তি নিয়েই ব্যাগটা খুলতেই দেখলাম হাজার নোটের একটা বান্ডিল সহ আরো বেশ কিছু টাকা। সেই সাথে ডাক্তারের অনেক প্রেসক্রিপশন, এক্স রে রিপোর্ট সহ ওষুধপত্র। নিঃসন্দেহে এটা রোগীর সবচাইতে প্রয়োজনীয় ব্যাগ।
বিশ্বাস করুন এতগুলো টাকা দেখে অনেক অভাবে থাকা এই আমার কিন্তু একটুও লোভ হয়নি। বরঞ্চ বছর দুয়েক আগে আমার মৃত বাবার মুখখানা ভেসে উঠলো। হার্ট এটাক করা আমার বাবাকে বাচাতে হাজারো চেষ্টা করেছিলাম। এমনকি ধার দেনা করে চল্লিশ হাজার টাকা খরচ করেও বাবাকে শেষ পযর্ন্ত বাচাতে পারিনি। আট দিন হসপিটালে থাকার সময়টায়, গরীবের কাছে চিকিৎসার টাকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।
তাইতো যাত্রীকে আবারো ফোন দিলাম। ব্যাগটা নিরাপদ হেফাজতে আছে নিশ্চিত করতেই। কিন্তু বিধিবাম, মোবাইল ফোনটা এবারো বন্ধ পেলাম। এরপর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে গাড়ি ঘুরিয়ে গ্রীন লাইফে চলে এলাম। এইবার দারোয়ানেকে গাড়িটা দেখে রাখার অনুরোধ জানালাম। ততোক্ষণে হাসপাতালের সবাই গরীব রোগীর শেষ সম্বল বিক্রি করে আনা টাকার ব্যাগ হারিয়েছে, এটা জানা।
আমি ব্যাগটা নিয়ে দৌড়ে হাসপাতালে ঢুকতেই দেখি, একটা জটলা। ভিড় ঠেলে ঢুকতেই দেখি অসুস্থ বৃদ্ধ লোকটা মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে আছে। আর পাশে থাকা যুবকটি কেঁদে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই আমার হাতে ব্যাগটা দেখে যুবকটি লাফিয়ে এসে ব্যাগটা বুকের মধ্যে নিয়ে নিল।
আমার ওদেরকে স্বান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই। সত্যি বলতে কি ছেলেটির মোবাইলে চার্জ না থাকাতেই কিন্তু এত কিছু ঘটলো। হারানো ব্যাগ পাওয়ার আনন্দে অসুস্থ বৃদ্ধ লোকটির মুখে ফুটে উঠা হাসি দেখে, আমার মৃত বাবার কথা মনে পড়ে গেল। চাচার জন্য প্রাণভরে দোয়া করে গাড়ি নিয়ে আবারো রুটি রোজগারের উদ্দেশ্যে নেমে পড়লাম।
এই ঘটনার আট দিন পরে ঐ যুবক প্যাসেঞ্জারের ফোন পেলাম। ছেলেটা আমার প্রতি থাকা কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই ফোন দিল। ছেলেটার বাবার অপারেশন সাকসেসফুল, এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো জানতে পেরে আমার খুব ভালো লাগলো। আজ হসপিটাল ছেড়ে ওরা জামালপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। আমার কাছে মনে হল এ যেন কোন আপনজনের খুশির সংবাদ।
বৃদ্ধ লোকটার নাকি ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করার শখ ছিল। এজন্যই আমাকে ফোন দেওয়া, ওদেরকে দেখা দিতে পারবো কিনা জানতেই। আমি তখন ভাড়া নিয়ে মিরপুরে। তার উপর ঘন্টা দুয়েক সময় খরচ করা আমার জন্য বিলাসিতাই। তাইতো ফোনেই বৃদ্ধের সাথে কথা বলতে চাইলাম
"বাজান আমি গরীব মানু, টেহা পয়সা নাই। একডা খেত আছিল। হেইডা বেইচ্যা ঢাহা আইছি। তুমি যদি হেইদিন বেগডা না দিতা...." কথাটা বলেই বৃদ্ধের কান্নায় আমার চোখটাও সিক্ত। বারবার আমার মৃত অসহায় বাবার মুখ খানা ভেসে উঠলো।
" চাচা মিয়া আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি মাত্র। প্যাসেঞ্জারের হারানো জিনিস বুজাইয়া দেওন আমার কাম। আপনে খালি আমার জন্য দোয়া কইরেন। এতেই আমি খুশি হমু।" চোখ মুছতে মুছতে বৃদ্ধের অনুভূতিটা উপলব্ধি করে নিলাম।
"বাজান আল্লা যেন তোমারে অনেক বালা করে এই দোয়াডাই করলাম। তোমার জন্য আমি সারাজীবন দোয়া করুম।" যুবক ছেলেটি আবারো কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফোন রাখতেই একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন পেলাম।
"আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্হার এইচআর থেকে বলছি। আপনি ড্রাইভারের চাকুরিটাতে চুড়ান্ত ভাবে মনোনীত হয়েছেন। আগামী তিনদিনের মধ্যে আপনার দেওয়া পোস্টাল এড্রেসে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যাবেন। যদি না পান তাহলে আমাদের অফিসে যোগাযোগ করবেন। আমাদের সংস্হার পক্ষ থেকে আপনাকে আবারো অভিনন্দন।" অপ্রত্যাশিত এই ফোন কলটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য, যেন স্বপ্ন।
পার্মানেন্ট চাকুরী, মাসে চল্লিশ হাজার টাকা বেতন সেই সাথে বোনাস ও মেডিক্যাল সহ আরো অনেক ফ্যাসিলিটিজ। এ যেন গরীব ড্রাইভার মোখলেসের হঠাৎ করেই ভাগ্য পরিবর্তন। খুশিতে বউ বাচ্চা আর মায়ের কথা মনে পড়লো। নতুন করে বাচার আনন্দ অনুভব করলাম। মৃত বাবার মুখটাও ভেসে উঠলো। আর সবচাইতে বেশি কানে বাজতে লাগলো খানিকক্ষণ আগে বৃদ্ধ লোকটার বলা কথাটা "বাজান আল্লা যেন তোমারে অনেক বালা করে এই দোয়াডাই করলাম।"
সংগ্রহ - কিছু কথা কিছু হাসি
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the business
Telephone
Website
Address
Shop No. 23-28, Al-Arabia Jame Mosjid Market Section-7, Mirpur
Dhaka
1216