Citytouch

Citytouch

Share

31/05/2026

তাপ: এআই যুগের অদৃশ্য সংকট

এআই শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? অনেকেই বলবেন চিপের সংকট, কেউ বলবেন বিদ্যুতের চাহিদা, আবার কারও মতে সবচেয়ে বড় বাধা ডেটা সেন্টার তৈরির বিপুল খরচ। কিন্তু এই শিল্পের প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশের কাছে উত্তরটা অন্য রকম—‘তাপ’।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহৃত আধুনিক চিপগুলি প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ গণনা করে। এই কাজ করতে গিয়ে এগুলি প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে, আর সেই শক্তির বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত তাপে পরিণত হয়। তাই চিপ ঠাণ্ডা রাখার বিষয়টি এখন আর শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এটি নিজেই একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হচ্ছে।

আজকের ডেটা সেন্টারগুলিতে পরিস্থিতি এমন যে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি খরচ হতে পারে শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য। এর পেছনের বিজ্ঞানটাও খুব সহজ। কোনো যন্ত্র যত বেশি শক্তি ব্যবহার করবে, তত বেশি তাপ উৎপন্ন করবে।

এখন এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত জিপিইউ এবং অন্যান্য এআই অ্যাক্সিলারেটর এত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে যে এখন শুধু কর্মক্ষমতা বাড়ালেই হচ্ছে না, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সেটিও চিপ ডিজাইনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বাতাসের সীমা কোথায়?

বহু বছর ধরে ডেটা সেন্টার ঠাণ্ডা রাখার প্রধান উপায় ছিল এয়ার কুলিং। সার্ভারের র‍্যাকগুলির মাঝখান দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত করা হয়, আর চিলার বা এয়ার কন্ডিশনার গরম বাতাস বের করে দিয়ে নতুন করে ঠাণ্ডা বাতাস পাঠায়। কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থাই বেশ ভালভাবে কাজ করেছে।

একই আকারের চিপের মধ্যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ট্রানজিস্টর আর কম্পিউটিং ক্ষমতা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক এআই জিপিইউগুলি তাই কয়েক বছর আগের সার্ভার প্রসেসরের তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।

যে কারণে একই আকারের একটি চিপ থেকেই আগের তুলনায় অনেক বেশি তাপ বের হচ্ছে। আর সেই তাপ শুধু বাতাস দিয়ে সরিয়ে ফেলা কঠিন হয়ে উঠছে।

এ কারণেই প্রযুক্তি শিল্প ধীরে ধীরে এয়ার কুলিং থেকে লিকুইড কুলিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। এই পদ্ধতিতে চিপের খুব কাছ দিয়ে ধাতব প্লেট বা পাইপের ভেতর ঠাণ্ডা তরল প্রবাহিত করা হয়। চিপ থেকে তাপ সরাসরি সেই তরলে চলে যায়, তারপর তরলটি বাইরে গিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আবার ফিরে আসে।

তরলটি সরাসরি চিপের ওপর ঢেলে দেওয়া হয় না। এটি প্রবাহিত হয় একটি বিশেষ ধাতব অংশের ভেতর দিয়ে, যাকে বলা হয় কোল্ড প্লেট। কোল্ড প্লেটের ভেতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম ও সিল করা চ্যানেল থাকে। চিপ থেকে তাপ সংগ্রহ করে সেই তাপ তরলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল কাজটিই করে এই কোল্ড প্লেট।

কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। আধুনিক এআই চিপ এত বেশি তাপ তৈরি করে যে প্রচলিত কোল্ড প্লেট অনেক সময় পুরো চিপকে সমানভাবে ঠাণ্ডা রাখতে পারে না।

তখন কিছু জায়গায় অতিরিক্ত গরম অংশ বা ‘হট স্পট’ তৈরি হয়। আবার কোল্ড প্লেটের ভেতরের চ্যানেল যত জটিল হয়, তরল চালাতে তত বেশি চাপ ও শক্তি লাগে। অর্থাৎ তাপ সরাতে গিয়ে কুলিং ব্যবস্থাই আবার বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ শুরু করে।

এই জায়গাতেই গবেষকদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের গবেষক ফিলিপ মিলকোভিচ এবং তার সহকর্মীরা ভাবতে শুরু করেন, কোল্ড প্লেটের ভেতরের পথগুলি যদি গাছের শিকড়, রক্তনালি কিংবা নদীর শাখা-প্রশাখার মত ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি তাপ আরও দ্রুত এবং সমানভাবে সরানো সম্ভব?

কিন্তু সমস্যা ছিল বাস্তবায়নে। এমন জটিল নকশা প্রচলিত উৎপাদন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

গাছের শিকড়, রক্তনালি আর থ্রিডি-প্রিন্টেড তামা

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষকেরা এমন একটি কোল্ড প্লেট তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা প্রচলিত নকশার তুলনায় অনেক বেশি দক্ষভাবে তাপ সরাতে পারে। তবে তাদের লক্ষ্য শুধু আরেকটি নতুন কোল্ড প্লেট বানানো ছিল না।

তারা এমন একটি নকশাকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যা এতদিন উৎপাদন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কেবল ধারণা হিসাবেই ছিল।

একবার গাছের শিকড়, রক্তনালি বা ফুসফুসের বায়ুনালির দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। এগুলি সবই অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত, যাতে তরল বা গ্যাস খুব দক্ষভাবে প্রতিটি অংশে পৌঁছাতে পারে। গবেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, কোল্ড প্লেটের ভেতরের চ্যানেলগুলিও যদি এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি তাপ আরও দ্রুত এবং সমানভাবে সরানো সম্ভব হবে?

প্রচলিত ড্রিল বা মিলিং মেশিন দিয়ে সোজা বা তুলনামূলক সরল চ্যানেল তৈরি করা যায়। কিন্তু গাছের শিকড়ের মত জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। সে কারণে বহু বছর ধরে এই ধারণা গবেষণাপত্র আর কম্পিউটার মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

এ পদ্ধতিতে কম্পিউটারকে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যেমন, “যত বেশি সম্ভব তাপ সরাও, কিন্তু তরল চলাচলে যত কম সম্ভব বাধা তৈরি করো।” এরপর সফটওয়্যার হাজার হাজার সম্ভাব্য নকশা পরীক্ষা করে দেখে এবং ধাপে ধাপে সবচেয়ে কার্যকর আকৃতিটি বের করে আনে।

মজার বিষয় হল, শেষ পর্যন্ত যে নকশাগুলি পাওয়া যায়, সেগুলি প্রায়ই গাছের শিকড়, রক্তনালি বা প্রবালের মত দেখতে হয়। দেখতে অদ্ভুত লাগলেও পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলি অত্যন্ত কার্যকর।

এই ধরনের জটিল নকশা তৈরি করতে গবেষকদের দরকার ছিল তামা। কারণ তামা পৃথিবীর অন্যতম সেরা তাপ পরিবাহী ধাতু। কিন্তু সমস্যা হল, প্রচলিত ধাতব থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তামা নিয়ে কাজ করাই বেশ কঠিন। লেজারের আলো তামা থেকে সহজে প্রতিফলিত হয়ে যায়, তাই এটি প্রিন্ট করা কঠিন হয়। আবার উচ্চ তাপমাত্রায় বিকৃতি ঘটার ঝুঁকিও থাকে।

তারা ব্যবহার করেন প্রতিষ্ঠানটির Electrochemical Additive Manufacturing বা ECAM প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে ধাতুকে গলিয়ে আকার দেওয়া হয় না। বরং পানিভিত্তিক একটি ইলেক্ট্রোলাইট দ্রবণ থেকে ধীরে ধীরে তামার স্তর জমিয়ে কাঙ্ক্ষিত আকৃতি তৈরি করা হয়। ফলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল গঠন তৈরি করা সম্ভব হয়, সেই সঙ্গে বিকৃতি বা ফাটল তৈরির ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।

গবেষক বাজমি এবং তার সহকর্মীদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা ৩০ থেকে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত সূক্ষ্ম গঠন তৈরি করতে পেরেছেন। তুলনা করলে বলা যায়, এটি মানুষের একটি চুলের প্রস্থের চেয়েও ছোট। গবেষণাটি Fabric8Labs-এর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে এবং এর অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ।

একদিকে টপোলজি অপটিমাইজেশন এমন নকশা তৈরি করেছে, যা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ। অন্যদিকে ECAM প্রযুক্তি সেই জটিল নকশাকে বাস্তবে তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে। বহু বছর ধরে কম্পিউটারের তৈরি আদর্শ নকশা আর বাস্তব উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে যে ফাঁক ছিল, এই গবেষণা সেই ব্যবধান কমানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

৫৫০ মেগাওয়াট থেকে ১১ মেগাওয়াট?

গবেষকদের হিসাব বলছে, বড় একটি ডেটা সেন্টারে সার্ভার ঠাণ্ডা রাখতে যেখানে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে, সেখানে তাদের নতুন কুলিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে সেই চাহিদা তাত্ত্বিকভাবে মাত্র ১১ মেগাওয়াটের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।

এটি কোনো চালু ডেটা সেন্টারে পাওয়া বাস্তব ফল নয়। সংখ্যাটি এসেছে গবেষকদের মডেলিং ও বিশ্লেষণ থেকে। বাস্তবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার শুরু হলে ফল কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবু এই হিসাব একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় উন্নতির সুযোগ এখনও অনেক বড়।

এই সম্ভাবনার মূল কারণ নতুন কোল্ড প্লেটের নকশা। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি প্রচলিত নকশার তুলনায় আরও দক্ষভাবে তাপ সরাতে পারে। একই সঙ্গে এর ভেতর দিয়ে তরল চলাচলও তুলনামূলক সহজ। তাই শুধু বেশি তাপ অপসারণই সম্ভব হয় না, সেই কাজ করতে শক্তিও লাগে কম।

আজ এআই খাতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠছে বিদ্যুতের প্রাপ্যতা। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, জমি, পানি এবং অবকাঠামো পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।

যদি কুলিং আরও দক্ষ করা যায়, তাহলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই আরও বেশি কম্পিউটিং শক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে পরিচালন ব্যয় কমতে পারে, বিদ্যুতের চাপ কমতে পারে, এমনকি কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পেতে পারে।

অবশ্য নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হলেই যে আগামীকাল থেকে সব ডেটা সেন্টারে সেটি ব্যবহার শুরু হবে, এমন নয়। গবেষণাগারে সফল হওয়া আর শিল্প পর্যায়ে সফল হওয়া এক বিষয় নয়। উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং খরচ—সবকিছুই আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।

গবেষণাপত্রেও প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে কখন ব্যবহার শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেওয়া হয়নি। ফলে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

ভবিষ্যতের কম্পিউটিং বিপ্লব শুধু আরও শক্তিশালী চিপের ওপর নির্ভর করবে না। সেটি নির্ভর করবে সেই চিপকে কত দক্ষভাবে ঠাণ্ডা রাখা যায়, তার ওপরও। খুব সম্ভব, আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্ভাবন প্রসেসরের ভেতরে নয়, বরং প্রসেসরের চারপাশে ঘটবে।

#প্রসেসর #তাপ #এআই

21/05/2026

ইজেকশন সিট: দুর্ঘটনার মুহূর্তে পাইলটের জীবনরক্ষাকারী আসন

আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলির ককপিটের ভেতরে এমন একটি প্রযুক্তি লুকিয়ে থাকে, যা নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে শেষ মুহূর্তে পাইলটের জীবন রক্ষা করতে পারে। এর নাম ‘ইজেকশন সিট’।

কোনো বিমান যদি নিয়ন্ত্রণ হারায়, আগুন ধরে যায়, কিংবা আকাশেই ভেঙে পড়ার অবস্থায় পড়ে, তখন পাইলটের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় থাকে। সেই মুহূর্তে ককপিট খুলে লাফ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ বিমানের গতি, বাতাসের চাপ এবং মাধ্যাকর্ষণ জনিত বল চালককে কার্যত আসনের সঙ্গে চেপে ধরে।

এই জটিল পরিস্থিতিতেই ইজেকশন সিট কাজ করে। শক্তিশালী বিস্ফোরক, স্প্রিং বা ধাক্কা দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা (ক্যাটাপল্ট) এবং রকেট মোটরের সাহায্যে পুরো সিটটিকে পাইলটসহ বিমান থেকে এক ঝটকায় বাইরে ছুড়ে দেওয়া হয়। আর প্যারসুট ধাপে ধাপে নিজে থেকেই খুলে যায়।

আকাশে বেচে থাকার প্রথম লড়াই

বিমানের শুরুর যুগে জরুরি অবস্থায় বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল “বেইল আউট”, অর্থাৎ ককপিট থেকে নিজে লাফ দেওয়া। কিন্তু বিমানের গতি বাড়তে থাকলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড বাতাস পাইলটকে ককপিটের ভেতরেই আটকে ফেলত, আর কেউ কেউ বের হলেও অনেক সময় বিমানের ডানা বা লেজে ধাক্কা খেত।

এই সমস্যার সমাধান খোঁজা শুরু হয় ১৯১০ সালের দিকেই। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ উদ্ভাবকএভারার্ড ক্যালথ্রপ কমপ্রেসড এয়ারচালিত একটি ইজেকশন সিটের পেটেন্ট নেন, যদিও সেটি বাস্তবে ব্যবহার করা হয়নি।

১৯২০-এর দশকে রোমানীয় উদ্ভাবক আনাস্তাসে দ্রাগোমির এবং তার সহযোগী তানাসে দব্রেস্কু আধুনিক ইজেকশন সিটের মত একটি নকশা তৈরি করেন।

তাদের ডিজাইনে ক্যাটাপল্টের সাহায্যে পুরো ককপিটই পাইলটসহ বিমান থেকে ছিটকে বের হয়ে আসত। ১৯২৯ সালে প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে এর সফল পরীক্ষাও করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রযুক্তিটি সত্যিকারের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধবিমান, বিশেষ করে জার্মান জেট বিমানগুলির গতি এত বেড়ে গিয়েছিল যে জরুরি অবস্থায় পাইলটের পক্ষে ককপিট থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই কঠিন পরিস্থিতি থেকেই তৈরি হল ইতিহাসের প্রথম কার্যকর ইজেকশন সিট। এটি বসানো হয়েছিল জার্মানির 'হাইনকেল হি-২৮০' জেট বিমানে।

১৯৪২ সালের ১৩ জানুয়ারি এই বিমানের টেস্ট পাইলট হেলমুট শেঙ্ক ইতিহাসের প্রথম সফল জরুরি ইজেকশন সম্পন্ন করেন। এরপর যুদ্ধের শেষ দিকে 'হি-১৬২' বিমানের মাধ্যমে আরও উন্নত ও বিস্ফোরক-চালিত সিস্টেমের ব্যবহার শুরু হয়। এখান থেকেই আধুনিক ইজেকশন সিটের যুগ শুরু।

মার্টিন-বেকার এবং দুই-ধাপের বিপ্লব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিমান শব্দের চেয়েও বেশি গতিতে উড়তে শুরু করলে পুরোনো ইজেকশন ব্যবস্থা আর কার্যকর থাকল না। তখন ব্রিটিশ কোম্পানি Martin-Baker নতুন ধরনের ইজেকশন সিস্টেম তৈরি করে।

১৯৪৬ সালে তাদের সিস্টেম প্রথম সফল ফ্লাইট টেস্ট পাস করে, যখন প্রকৌশলী বার্নার্ড লিঞ্চ একটি Gloster Meteor বিমান থেকে নিরাপদে ইজেক্ট করেন।

প্রথম দিকের ইজেকশন সিটে “গান ক্যাটাপল্ট” ব্যবহার করা হত। বিস্ফোরণের ধাক্কায় সিট ওপরে ছিটকে উঠত। কিন্তু বেশি শক্তি হলে পাইলটের মেরুদণ্ডে আঘাত লাগত, আর কম শক্তি হলে তিনি বিমানের লেজে ধাক্কা খেতে পারতেন।

পরে আসে দুই-ধাপের ব্যবস্থা। প্রথমে ক্যাটাপল্ট সিটকে ককপিটের বাইরে ঠেলে দেয়, তারপর রকেট মোটর সেটিকে আরও ওপরে ও দূরে নিয়ে যায়। এতে ইজেকশন অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে।

ভেতরের ঘটনা

আধুনিক ইজেকশন সিটে একটি টাইমিং কম্পিউটার বা “সিকোয়েন্সার” থাকে, যা পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ করে। পাইলট ইজেকশন হ্যান্ডেল টানার সঙ্গে সঙ্গেই ককপিটের কাচ (ক্যানোপি) উড়ে যায় বা ভেঙে যায়। এরপর গান ক্যাটাপল্ট সিটটিকে ওপরে ঠেলে দেয়, আর কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই চালু হয় রকেট মোটর।

সিটটিকে বাতাসে স্থির রাখতে প্রথমে একটি ছোট প্যারাসুট (drogue chute) বের হয়, যাতে এটি ঘুরতে না থাকে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর পাইলট ও সিট আলাদা হয়ে যায় (ম্যান-সিট সেপারেশন), তারপর খোলে মূল প্যারাসুট। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।

প্রথম দিকের ইজেকশন সিটের একটি বড় সমস্যা ছিল—এগুলি কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতি দরকার হত। খুব নিচু থেকে ইজেক্ট করলে প্যারাসুট খোলার সময়ই পাওয়া যেত না। পরে “জিরো-জিরো” প্রযুক্তি এই সীমাবদ্ধতা দূর করে। এর ফলে শূন্য উচ্চতা ও শূন্য গতিতেও পাইলটকে বাঁচানো সম্ভব হয়।

আধুনিক সিটের শক্তিশালী রকেট প্যাক বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকলেও পাইলটকে যথেষ্ট ওপরে তুলে দিতে পারে, যাতে নিরাপদে প্যারাসুট খুলতে পারে।

তবে সব পরিস্থিতিতে ইজেকশন সমান নিরাপদ নয়। বিমান চালনায় “সেফ এনভেলপ” নামে একটি ধারণা আছে, অর্থাৎ কোন গতি, উচ্চতা ও অবস্থানে ইজেক্ট করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

বিমান যদি দ্রুত পাক খেতে খেতে নিচে নামতে থাকে (স্পিন) বা খুব কম উচ্চতায় থাকে, তাহলে ইজেকশন প্রাণঘাতী হতে পারে। আবার বিমান অত্যন্ত দ্রুত ঘুরলে (উচ্চ রোল রেট) প্যারাসুটের দড়ি জড়িয়ে যেতে পারে এবং পাইলট গুরুতর আঘাত পেতে পারেন।

মানবদেহের ওপর নির্মম চাপ

ইজেকশন সিট পাইলটের জীবন বাঁচালেও মানবদেহের ওপর এটি প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ইজেকশনের সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাইলটের শরীরে ১২-১৪ জি পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে, অর্থাৎ তখন শরীরের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি অনুভূত হয়।

কিছু পুরোনো সোভিয়েত সিস্টেমে এই চাপ ২০ জিরও বেশি ছিল। এর ফলে মেরুদণ্ডে আঘাত, কশেরুকা ফেটে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পিঠের সমস্যাও দেখা গেছে।

এর সঙ্গে থাকে “এয়ার ব্লাস্ট” বা বাতাসের ভয়ংকর ধাক্কা। শব্দের গতির চেয়েও বেশি গতিতে ইজেক্ট করলে বাতাস প্রায় শক্ত দেয়ালের মত আঘাত করে, আর গতি বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে।

এই তীব্র চাপে পাইলটের হাত-পা ছিটকে যাওয়া, হেলমেট ভেঙে যাওয়া বা ত্বক ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই আধুনিক ইজেকশন সিটে “লিম্ব রেস্ট্রেইন্ট সিস্টেম” ব্যবহার করা হয়, যা ইজেকশনের সময় পাইলটের হাত ও পা শক্তভাবে শরীরের সঙ্গে ধরে রাখে।

বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইজেকশন সিস্টেমগুলি

আধুনিক ইজেকশন সিটের জগতে সবচেয়ে পরিচিত দুটি নাম হল আমেরিকার ACES II এবং রাশিয়ার K-36DM। পশ্চিমা বিশ্বের বহু জনপ্রিয় যুদ্ধবিমান—যেমন F-15, F-16 ও B-1B বোমারু বিমানে ব্যবহৃত হয়েছে ACES II সিট। এটি নির্ভরযোগ্যতা ও দ্রুত কাজ করার ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

অন্যদিকে, রুশ K-36DM সিটটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পাইলটকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত। প্রচণ্ড গতি ও বাতাসের তীব্র ধাক্কার মধ্যেও এটি কাজ করে। এর একটি বিশেষ ব্যবস্থা হল “উইন্ড ব্লাস্ট ডিফ্লেক্টর”, যা ইজেকশনের সময় পাইলটের মুখ ও বুককে বাতাসের মারাত্মক আঘাত থেকে রক্ষা করে।

দুই সিটের যুদ্ধবিমান বা ট্রেইনার বিমানে আবার থাকে “কমান্ড ইজেকশন” ব্যবস্থা। এতে একজন পাইলট ইজেক্ট করলেই অন্যজনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে যান, যাতে বিপদের মুহূর্তে সময় নষ্ট না হয়।

হেলিকপ্টারে ইজেকশন সিট ব্যবহার অসম্ভব বলেই দীর্ঘদিন মনে করা হত, কারণ মাথার ওপর ঘুরতে থাকে রোটর ব্লেড। কিন্তু রাশিয়ার Kamov Ka-50 ও Ka-52 যুদ্ধহেলিকপ্টারে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। Zvezda কোম্পানির K-37 সিস্টেমে ইজেকশনের ঠিক আগে বিস্ফোরক বোল্ট দিয়ে রোটর ব্লেড উড়িয়ে ফেলা হয়, তারপর পাইলটকে ওপরে ছিটকে বের করে আনা হয়।

ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে ফেরাদের ক্লাব

আধুনিক ইজেকশন সিট এখন শুধু যান্ত্রিক যন্ত্র নয়, ধীরে ধীরে এটি কম্পিউটার-নির্ভর স্মার্ট সিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। F-35-এর মত আধুনিক বিমানে “অটো-ইজেকশন” নিয়েও কাজ চলছে, যাতে পাইলট অজ্ঞান হলেও সিস্টেম নিজেই জীবনরক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

মার্টিন-বেকার কোম্পানির একটি বিশেষ ক্লাব আছে, “Ejection Tie Club”। সদস্য হতে পারেন শুধু তারাই, যারা তাদের ইজেকশন সিট ব্যবহার করে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত তাদের সিট ৭,৮০০-এর বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

#বিমান #পাইলট #ইজেকশন_সিট

Want your business to be the top-listed Finance Company in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Address


City Bank Center, 28, Gulshan Avenue, Gulshan 1, Bangladesh
Dhaka
1212