Taking the First Step

Taking the First Step

Share

29/06/2024

আমি যখন ভার্সিটিতে পড়তাম তখন আমার এক ক্লাস মেট ছিলো হুজুর টাইপের। মুখে ধর্মীয় লম্বা দাড়ি, মাথায় টুপি, পাগড়ি, গায়ে থাকতো পাঞ্জাবি পাজামা। পাজামা থাকতো পায়ের টাকনুর ওপরে। সে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। নম্র স্বভাবের। মুখে সব সময় লাজুক হাসি থাকতো। আমরা বন্ধুরা ওকে নিয়ে নানা রকম মজা করতাম। জবাবে সে শুধু লাজুক হাসতো। ওর নাম ছিলো আবদুর রহমান।

আবদুর রহমান নাচ গান এসব থেকে দূরে থাকতো। মেয়েদের সাথে মিশতো না। মেয়েদের দেখলে মাথা নিচু করে ফেলতো।

মজা করার জন্য আমরা ওকে বলতাম,"আবদুর রহমান, তোমার প্রেম করতে ইচ্ছে করে না?"

আবদুর রহমান কিছু না বলে হাসতো।

আমরা তখন বলতাম,"অন্য মেয়েদের সাথে না হয় প্রেম করলে না। কিন্তু ইসলামিক মাইন্ডের কোনো মেয়ের সাথে তো প্রেম করতে পারো?"

আবদুর রহমান শুধু হেসে যেতো। কিছু বলতো না।

বন্ধুদের মধ্যে আমি নারী স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলাম। আবদুর রহমান ছেলে হিসেবে সৎ হলেও একটা কারণে ওকে অপছন্দ করতাম। ও ছিলো গোঁড়া। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আবদুর রহমান যে মেয়েকে বিয়ে করবে সে মেয়ের জীবন তছনছ হয়ে যাবে। মেয়েটাকে কঠিন পর্দায় মুড়ে ফেলবে, এবং চার দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলবে।

তবে এই অপছন্দের কথা কখনো ওকে বলতাম না। কারণ বিষয়টা ধর্মীয়। ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা ছিলো।

পড়াশোনা জীবন শেষ করে আমরা কর্মজীবনে ঢুকলাম। এই সময় বন্ধুরা অনেকে বিয়ে করলো। আবদুর রহমানও বিয়ে করলো। সে আরবী লাইনে পড়ছে এমন এক মেয়েকে বিয়ে করলো। মেয়েটা তখন ফাজিল অর্থাৎ ডিগ্রিতে পড়ছিলো। পারিবারিক বিয়ে।

আবদুর রহমানের বিয়েতে আমরা গিয়েছিলাম। ওর বউকে দেখা সম্ভব হয় নি। বউকে লোকসমক্ষে আনা হয় নি। গোঁড়া আবদুর রহমান এমন করবে এটাই স্বাভাবিক ছিলো।

সেদিন আমরা বন্ধুরা একে অন্যকে আফসোস করে বলছিলাম,"বেচারা মেয়েটার জন্য খারাপ লাগছে। মেয়েটার পড়াশোনা এখানেই শেষ। কারণ, গোঁড়া আবদুর রহমান কখনো মেয়েটাকে বিয়ের পর পড়তে দেবে না।"

কিন্তু আমাদের ধারণা মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে আবদুর রহমানের স্ত্রী বিয়ের পরও পড়তে লাগলো।

ততোদিনে আমিও বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রী চাকরি করতো।

স্ত্রীকে একদিন আবদুর রহমানের কথা বললাম।
তারপর বললাম,"সে তার স্ত্রীকে কেনো পড়াশোনা করাচ্ছে বুঝতে পারছি না। সে তো আর স্ত্রীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে দেবে না।"

স্ত্রী বললো,"কেনো করতে দেবেন না?"

"আবদুর রহমান গোঁড়া প্রকৃতির মানুষ। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং সমান অধিকার এসব মানে না।"

"কে বললো তিনি এসব মানেন না?"

"দেখছো না, বউকে কেমন কঠিন বোরকার মধ্যে রাখে। বউকে বন্ধুদের সামনে পর্যন্ত আসতে দেয় না। মেয়েটার জীবনটা শেষ হয়ে গেলো।"

"কোনো মেয়ে বোরকা পরলে কিংবা প্রয়োজন ছাড়া পুরুষদের সামনে না এলে তার জীবন শেষ হয়ে যায় না। অনেক মেয়ে আছে এমন জীবনকেই সম্মানের মনে করে। তাই সব মেয়েকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক না।"

আমি আর কিছু বললাম না। তবে মনে মনে বিরক্ত হলাম।

এরপর ব্যস্ততার কারণে বেশ কয়েক বছর আবদুর রহমানের সাথে দেখা হয় নি। একদিন পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো। জানতে পারলাম সে তখন দু সন্তানের বাবা। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। আমিও তখন এক ছেলে এক মেয়ের বাবা হয়েছি।

বললাম,"আবদুর রহমান, কোথায় থাকো তুমি? তোমাকে এখন দেখা যায় না কেনো?"

আবদুর রহমান তার স্বভাবগত লাজুক হেসে বললো,"আমি এখন গ্রামের বাড়ি থাকি।"

"তোমার স্ত্রীকেও সেখানে নিয়ে গেছো?"

"হম।"

শুনে আবদুর রহমানের স্ত্রীর জন্য দীর্ঘশ্বাস পড়লো। শহরে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ে গ্রামে ভালো থাকার কথা নয়। মেয়েটার জীবনটা বরবাদ হয়ে গেলো।

বললাম,"শহরে তো ভালো ছিলে। ভালো চাকরি করতে। তাহলে হঠাৎ গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেনো নিলে?"

"গ্রামে একটা মহিলা মাদ্রাসা দিয়েছি। নিজেদের টাকায় করেছি। আমার স্ত্রী তার প্রিন্সিপাল। আমরা স্বামী স্ত্রী মিলে মাদ্রাসাটা চালাচ্ছি।"

কৌতূহল নিয়ে বললাম,"গ্রামে মহিলা মাদ্রাসা দেয়ার স্বপ্ন তোমার না তোমার স্ত্রীর?"

"আমার স্ত্রীর। আমি সহযোগিতা করেছি মাত্র।"

শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আবদুর রহমান বলে কী! গ্রামে চলে যাওয়ার কথা শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম, আবদুর রহমানের কারণে ওর স্ত্রী গ্রামে চলে গেছে। কিন্তু এখন দেখছি ঘটনা উল্টো। স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণের জন্য আবদুর রহমান শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। বিয়ের পর আবদুর রহমান স্ত্রীর পড়াশোনায় কেনো বাধা দেয় নি সেটা এখন বুঝতে পারলাম।

আর এদিকে আমার স্ত্রী সন্তান হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে গৃহিণী হয়ে গেলো। সে অবশ্য চাকরি করে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমার মা'র জন্য পারে নি। আর আমিও মায়ের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলি নি।

যে আমি এক সময় মেয়েদের স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলাম, পরবর্তীতে সংসার জীবনের জটিলতায় পড়ে সেই আমি পিছিয়ে গেলাম। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিতাম যে, মায়ের জন্য পারি নি, নইলে পারতাম। এটা যে অজুহাত, ভালোই বুঝতাম। তবু না বোঝার ভান করতাম।

নারী স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের ক্ষেত্রে গোঁড়া আবদুর রহমান যে আমার চেয়ে এগিয়ে গেলো, এটা আবিষ্কার করে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

বাড়ি ফিরলে স্ত্রী বললো,"কী হয়েছে তোমার? মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ লাগছে?"

সে কথার জবাব না দিয়ে স্ত্রীর হাত ধরে বললাম,"তুমি আবার চাকরি করা শুরু করো?"

স্ত্রীকে এ কথা বলার কারণ হলো, গোঁড়া আবদুর রহমানের কাছে হেরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

স্ত্রী অবাক হয়ে বললো,"কী করে চাকরি করবো? মা তো চান না।"

দৃঢ় গলায় বললাম,"মাকে আমি সামলাবো। তুমি চাকরিটা শুরু করো।"

আমার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ স্ত্রী ধরতে পারলো না। তবে সে পুনরায় চাকরি করা আরম্ভ করলো। আর আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

তবে শেষ পর্যন্ত গোঁড়া আবদুর রহমানের কাছে পুরোপুরি হেরে গেলাম। কীভাবে সেটা হয়েছিলো বলিঃ

আমার তখন অবসর জীবন চলছে। ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। নানা, দাদা হয়েছি। জীবনের এই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজের সম্পত্তিগুলো স্ত্রী ছেলেমেয়েদের মাঝে শরীয়া আইন অনুযায়ী বন্টন করে দেবো। অর্থাৎ স্ত্রী পাবে স্বামীর সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ। আর ছেলে যা পাবে, তার অর্ধেক পাবে মেয়ে।

সম্পত্তি বন্টনের সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছুদিন পরই আবদুর রহমানের মৃত্যুর খবর পেলাম। খুবই দুঃখের সাথে আমরা বন্ধুরা তার জানাজা পড়তে গেলাম।

সেখানে কথায় কথায় জানতে পারলাম, আবদুর রহমান তার সম্পত্তির অর্ধেক দিয়েছে তার স্ত্রীকে, আর বাকি অর্ধেক সমান দুই ভাগে ভাগ করে দুই ছেলে মেয়েকে দিয়েছে।

আবদুর রহমানের কাণ্ড দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। সে সারাজীবন নিখুঁত ভাবে ইসলাম অনুসরণ করে শেষ মুহূর্তে এসে এমন ইসলাম বহির্ভূত কাজ কী করে করলো?

ওর ছেলেকে পরে একদিন জিজ্ঞেস করলাম,"তোমার বাবা যে ভাবে সম্পত্তি বন্টন করেছে সেটা তো কোরআনে নেই। তাহলে সে এটা কী করে করলো? কোরআনের বাইরে কোনো কিছু করার মানুষ তো তোমার বাবা ছিলো না।"

ছেলে জবাবে বললো,"বাবাকে এ প্রশ্ন সবাই করেছিলো। বাবা উত্তরে বলেছিলেন, 'স্ত্রীকে স্বামীর সম্পত্তির অর্ধেক দেয়া এবং ছেলে মেয়েকে সমান সম্পত্তি দেয়া কোরআনে নেই বটে, তবে কোরআনের কোথাও এটাও নেই যে, স্ত্রীকে স্বামীর অর্ধেক সম্পত্তি এবং ছেলে মেয়েকে সমান সম্পত্তি দেয়া যাবে না।' বাবা এটাও বলেছেন,'আমার যদি ছেলে মেয়ে না থাকতো তাহলে সম্পত্তির সবটুকু স্ত্রীকে দিয়ে দিতাম'।"

তাজ্জব হয়ে গেলাম আবদুর রহমানের চিন্তা ভাবনা দেখে। সে যে কাজ করেছে সেটা আমি কখনো করতে পারবো না। কারণ, এটা করলে শরীয়া ভঙ্গ করেছি বলে যে আক্রমণের স্বীকার হবো, তা মোকাবিলা করার সাহস এবং জ্ঞান আমার নেই। সেদিন বুঝলাম, সারাজীবন যে আবদুর রহমানকে নিয়ে মজা করেছি, ভেবেছি, ওর মতো ধর্মপরায়ণ মানুষেরা মেয়েদের স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের পথে বড়ো বাধা, সেই আবদুর রহমান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, মেয়েদের স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের ব্যাপারে সে যতোখানি এগিয়ে ছিলো, আমি কিংবা আমরা বন্ধুরা তার ধারে কাছেও ছিলাম না।

আবদুর রহমানের মৃত্যুর কদিন পর আমার ছেলের মধ্যে পরিবর্তন দেখলাম। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করলো। লম্বা দাড়ি রাখলো। পাঞ্জাবি পাজামা পাগড়ি পরা শুরু করলো। ওর এই পরিবর্তন দেখে ছেলে গোঁড়া হয়ে যাচ্ছে বলে আঁতকে উঠি নি। কারণ ততোদিনে বুঝে গেছি, ধর্ম পালন করা গোঁড়ামি নয়। বরঞ্চ ধর্ম পালনকারীদের যারা গোঁড়া বলে তারাই মূলত গোঁড়ামিতে নিমজ্জিত। যেমন আমি গোঁড়ামিতে নিমজ্জিত ছিলাম।

মন থেকে চাই, আমার সন্তানেরা তেমন না হোক।

"কুশায়ার গায়ে রোদ"
- রুদ্র আজাদ

Copy

16/04/2023
Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Telephone

Website

Address


Dhaka Division
Dhaka