MAK
বৃটিশ আমলে একবার হজ্জ বন্ধ হয়ে যায়। তখনকার আলেমদের উল্লেখযোগ্য অংশ ফতোয়া দেয় যে হজ্জ করা আর ফরজ না। হজ্জের অন্যতম শর্ত হচ্ছে 'আমনু-ত্বারিক' বা রাস্তা নিরাপদ হওয়া। মোঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকেই সমুদ্র পথে ইউরোপীয়দের বিশেষত পর্তুগিজ জলদস্যুদের গুণ্ডামি শুরু হয়, প্রায় প্রায় মুসলিম বণিক ও হাজীদের জাহাজগুলোতে হামলা লুটপাট চালাতো। এই প্রেক্ষিতে দুর্বলচিত্তের আলেমরা এই ফতোয়া দেয়।
যাহোক, হজ্জ বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল কয়েক দশক দীর্ঘ একটি বেদনাদায়ক আধ্যাত্মিক ট্রাজেডি। সাইয়্যেদ আহমদ ইরফান ও তার শিষ্য শাহ মুহম্মদ ইসমাইল শহীদ রঃ নামের দুজন প্রখ্যাত বুজুর্গ প্রথম চিন্তা করলেন যে শুধু জলদস্যুদের হজ্জের মতন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিধানের মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। উনারা তখন দিল্লির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শাহ আব্দুল আজিজ দেহলবী রঃ এর সাথে আলাপ করেন এবং উনার মাধ্যমে পাল্টা ফতোয়া জারি করেন। উনি যুক্তি দেখান যে সমুদ্রে ঝড়ের কারণেও প্রায় প্রায় জাহাজ ডুবি ঘটে, ঠিক তেমনি জলদস্যুর হামলাও স্রেফ জাহাজ ডুবির মতন একটা সম্ভাবনা। স্রেফ একটা আতঙ্ক বা সম্ভাবনার ভয়ে সম্পূর্ণ রূপে হজ্জ পরিত্যাগ করা যায় না।
তবুও কয়েক যুগ যাবৎ হজ্জ বন্ধ থাকায় মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার হচ্ছিল না। সবার মনে ভয় ভয়। অবশেষে সাইয়েদ আহমদ ইরফান রঃ সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি নিজেই এবার শিষ্যদের নিয়ে হজ্জ করবেন।
সময় ১৮৬১ সাল।
সে উদ্দেশ্য তিনি গোটা হিন্দুস্থানে মানুষের মাঝে দাওয়াতি সফরে বের হয়ে পড়েন। প্রায় ৭৫৬ জন হাজী সফর সঙ্গী নিয়ে দিল্লি থেকে বিহার ও উড়িষ্যা হয়ে তিনি কোলকাতায় পৌছান এখন কোলকাতা হতেই জাহাজে সাওয়ার হোন। উনার হজ্জের সফর ছিল রীতিমতো এক অলৌকিক সফর।
বহুযুগ পর হজ্জ চালু হওয়ায় মানুষের মাঝে এক অদ্ভুৎ আবেগ বিরাজ করতেছিল। তখন হজ্জ আসলে এখন কর্পোরেট হজ্জের মতন এত মামুলি ব্যাপার ছিল না। দেখা গেলো উনি যে শহর দিয়ে পার হচ্ছিলেন, হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভীড়। সবাই দোয়া নিতে হাজির হতো হযরতের দরবারে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সুবাদে শায়েখ ইরফান রঃ এর বয়আত হোন এবং তওবা করে নিজের জীবন শুধরে নেন।
সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয় তাঁর জামাত কোলকাতায় আসার পরে। হাজার হাজার মানুষ শায়েখের দরবারে আসে বাইয়াত হতে, অসংখ্য মানুষ মুসলমান হয় উনার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটুও বিশ্রাম নিতে পারেননি। বলা হয় কোলকাতায় শায়েখের কয়েকদিনের উপস্থিতি গোটা কোলকাতার চিত্র বদলে দেয়। মদের দোকানগুলোতে বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায় প্রায়, দুয়েকজন যারা যেতো তাদের জন্য পরে গোপন পর্দা লাগানো হয়। নাট্যমঞ্চে পর্যন্ত খালি হয়ে পড়ে। ভাবতে পারেন একজন বুজুর্গের সাময়িক উপস্থিতি কেমন বদলে দিয়েছিল গোটা ইংরেজ অধ্যুষিত একটা শহরের চিত্র...??
এর মধ্যে একটা মজার ঘটনা ঘটে। টিপু সুলতানের পরাজয় ঘটার পরে ইংরেজরা সুলতানের বংশধরদের কোলকাতায় নিয়ে আসে যাতে ভবিষ্যৎ বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি না হয়। কোলকাতায় আসার টিপুর সন্তানরা একদম সেকুলার হয়ে যায়, একজন তো এক নাস্তিক দার্শনিকের সংস্পর্শে এসে পুরো হাফ-নাস্তিক হয়ে যায়।
তো শায়েখ ইরফান যখন কোলকাতায় আসে তখন টিপু সুলতানের ধর্মত্যাগী সন্তানটাও শায়েখের দরবারে হাজির হয়। উনার মনে তখন ইসলাম নিয়ে হাজারো সংশয় কাজ করছিল, কিন্তু উনি নাকি শায়েখকে দেখেই সব সংশয় কেটে যায়। তওবা করে আবার ধার্মিক হয়ে যায়। আল্লাহর ওলীদের আধ্যাত্মিকতার শক্তি এমনই হয়।
কবি আল্লামা ইকবালের ব্যাপারেও এমন ঘটনা বর্ণিত আছে। ইউরোপ থেকে ডক্টরেট করে আসার পরে উনি ভীষণ সংশয়বাদী হয়ে পড়েন, কিন্তু পরবর্তীতে আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রঃ নামে এক বুজুর্গ আলেমের সংস্পর্শে এসে শুধু উনার চেহারার দিকে তাকাতেই মনের সব সংশয় দূর হয়ে যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাসটাই ছিল আসলে সুফি দরবেশদের আধ্যাত্মিক জয়ের ইতিহাস। উনারা একেক এলাকায়, আর মানুষ শুধু উনাদের দেখেই পঙ্গপালের ন্যায় ঝাপিয়ে পড়ে হেদায়েত হয়ে যেতো। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শায়েখ আহমদ সারহিন্দি রাঃ এর মতন বুজুর্গরা স্রেফ নিজেদের রুহানি শক্তি দিয়েই সময়ের স্রোত বদলে দিয়েছিলেন।
আমাদের বর্তমান সময়ের এই আধ্যাত্মিক দুর্ভিক্ষের আমলে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি রঃ এর মতন বুজুর্গদের ভীষণ অভাব অনুভব করি..... যারা স্রেফ কদম ফেলেই সময়ের স্রোত বদলে দিতে পারতেন।
08/02/2021
Please be in touch
Click here to claim your Sponsored Listing.
Telephone
Website
Address
Dhaka
Opening Hours
| 09:00 - 17:00 |