Village lovers
30/07/2025
“পস্তুবালা—এক নাচনির নাম নয়, এক
অগ্নিপরীক্ষার গানে জন্ম নেওয়া মহাকাব্য”
(আপনাদের উপদেশ মতো বাবা মায়ের নাম সংগ্রহ করে পুনরায় দেবী পস্তুবালা কর্মকার সম্পর্কে দু চার কথা লিখলাম , যদি কোনো ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে আগেই ক্ষমা প্রার্থনা করি , আপনার গুনি বিচক্ষণ ব্যক্তি , আমি নাবালক মাত্র । আজ পর্যন্ত দেবীকে নিয়ে বাইরের লোকের অনেক লেখা পড়েছেন ; আজ না হয় আপনাদের ঘরের ছেলের লেখাটা একটু পড়ে বিচার করুন , ভালো লাগলে শেয়ার করে সবাইকে পড়ার সুযোগ করে দেন । )
কলমে: মন্টু কুম্ভকার
সন্ধ্যা নামলেই যখন পুরুলিয়ার মাঠঘাট নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন দূরে কোথাও মাদলের ধ্বনি ভেসে আসে। সেই শব্দ যেন পেরিয়ে আসে শতাব্দীর উপেক্ষা, লাঞ্ছনা আর কান্না। সেই তালে নেচে চলেছেন এক নারী—পস্তুবালা। তিনি শুধু একজন নাচনি নন, তিনি এক জীবন্ত প্রতিরোধ, এক অন্তরীক্ষের দাবিদার।
১৯৭০ সালে পুরুলিয়ার পুঞ্চা থানার কৈড়া-কর্মাটাঁড় গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা মনোহর সিং সর্দার—মাটি চষা মানুষ, আর মা বিমলা মুদি—এক ঝুমুর গানের গর্বিত উত্তরসূরি। পস্তুবালার শৈশব কেটেছে মায়ের ঘুঙুরের শব্দে, দ্যাঁড় নাচের ঘোরে। তখন তিনি জানতেন না এই ঘর, এই গ্রামই একদিন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাঁর—এক বৃদ্ধ স্বামীর সঙ্গে, যাঁর হাত ধরেই পস্তুবালার জীবনের প্রথম অধ্যায়টা শেষ হয়ে যায়। অপারেশনের নামে শরীর থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মাতৃত্ব, সম্মতি ছাড়াই। এটি শুধু এক নারীর দুঃখের কাহিনি নয়, এটি সেই সমাজের নিষ্ঠুর মুখোশ খুলে দেয়, যেখানে নারী শুধু উপার্জনের মেশিন।
তারপর একে একে কেটে গিয়েছে মেট্যালার মাসির বাড়ি, ঝি-এর কাজ, থালাবাসন ধোওয়া, আর ষড়যন্ত্রের ভয়। সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে পৌঁছেছিলেন বলরামপুরের ডুমারি গ্রামে, যেখানে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় রসিক বিজয় কর্মকারের হাত ধরে।
রসিক ছিলেন সেই বিরল মানুষ, যিনি পস্তুবালার মধ্যে শিল্পীকে দেখেছিলেন, উপার্জনের যন্ত্রকে নয়। কিন্তু সমাজ? সমাজ তো চেয়েছিল, নাচনি মানে দেহ, ঘৃণা আর নীচতা। পাড়া গাঁয়ের ভাষায় তাঁকে বলা হয়েছিল "ইয়াকে কেন নিয়ে আলি?" কিন্তু পস্তুবালা মাথা নত করেননি।
নিজেকে তৈরি করেছেন নিজে। গুরু হলেন সিন্ধুবালাদেবী—ছোটনাগপুরের বুলবুল। আর পস্তুবালা হলেন তাঁর ছায়া, তাঁর উত্তরাধিকার। প্রথম অনুষ্ঠান তেঁতলো গ্রামে, পারিশ্রমিক ৫০ টাকা। আজ সেই পস্তুবালাই অনুষ্ঠানের মুখ হয়েছেন কলকাতার শিশির মঞ্চ থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত।
পস্তুবালার জীবন শুধু সংগ্রাম নয়, এক ধ্রুবতারার পথচলা
রসিকের পরিবারের অবহেলা, এক কাপড়ে বছর কাটা, দিনের পর দিন অপমান সহ্য করা—সব পেরিয়ে পস্তুবালা গড়েছেন ‘মানভূম লোকসংস্কৃতি ও নাচনী উন্নয়ন সমিতি’। তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সমস্ত নাচনিদের জন্য সম্মানের পথ তৈরি করেছেন।
সুরুলিয়ায় যখন অনুষ্ঠান হয়, তখন তিনি ব্যস্ত থাকেন। সেই সময় তাঁকে ডাকা হয়েছিল জোড়াসাঁকোতে প্রশিক্ষণ দিতে, দিনে দুই হাজার টাকা ভাতা, খাবার, থাকা—সবকিছু। কিন্তু পস্তুবালা বেছে নিয়েছিলেন পুরুলিয়া ফেরার পথ। কারণ সেখানেই তাঁর হৃদয়, তাঁর দায়িত্ব।
পস্তুবালার জীবনের অনেক অজানা দিকও রয়েছে—
🔹 একবার এক মেয়ে তাঁর পায়ে পড়ে বলেছিল, "আমাকেও শেখাও, যাতে আমি এই নাচ দিয়ে আমার সংসার চালাতে পারি"—পস্তুবালা কেঁদে ফেলেছিলেন। সেই মেয়েটি আজ নিজে একজন স্বীকৃত ঝুমুর শিল্পী।
🔹 তিনি এখনও নিজের গ্রামে গিয়ে পারিশ্রমিক নেন না। বলেন, “এই মাটিই তো আমায় মানুষ করেছে, এখান থেকে আমি কিছু নেব না।”
🔹 পস্তুবালার কাছে এখনও কিছু পুরস্কার নেই, কারণ তিনি অনুষ্ঠান ফেলে সময়মতো পুরস্কার নিতে যেতে পারেননি। তাঁর মতে, “সম্মান যদি সময়ে না আসে, তবে আমি আমার ঘুঙুরেই সুখ খুঁজি।”
শেষ কথা নয়, শুরু...
আজও অনেক নাচনি—যাদের কেউ মরলে দেহ সৎকার হয় না। ফেলে দেওয়া হয় ভাগাড়ে। পস্তুবালা তাঁদের জন্য লড়েন, লেখেন, হাঁটেন। আজও অনেক মঞ্চে তিনি দাঁড়ান না নাচতে, দাঁড়ান প্রতিবাদ করতে।
পস্তুবালা এক নারী, যাঁর জীবনের গল্প মানে শুধু একটি শিল্পের ইতিহাস নয়, বরং সমাজের চেতনায় আঘাত। তিনি ঘুঙুর পরে জানান দিয়েছেন—নাচনি মানেই লাঞ্ছনা নয়, শিল্পও হতে পারে প্রতিবাদের ভাষা
20/07/2025
🌾 পুরুলিয়ার গ্রামজীবন – যেখানে মাটির শরীরে ইতিহাসের নিঃশ্বাস
লেখা - মন্টু কুম্বকার
পুরুলিয়া—একটা নাম নয়, একটা অনুভব। বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমের এই অঞ্চলটা যেন প্রকৃতি আর সংস্কৃতির মিলনবিন্দু। আর এই পুরুলিয়ার প্রাণ হলো তার গ্রামগুলো। এই গ্রামগুলোর প্রতিটি পথ, প্রতিটি শালগাছ, প্রতিটি পুকুরঘাট—সব যেন একটা করে জীবন্ত কাহিনি বলে।
সকালের আলো এখানে ধীরে ধীরে নামে, যেন কুয়াশার পর্দা সরিয়ে সূর্য নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। পাখির ডাক, গরুর হুম হুম, আর উঠোন ঝাঁটার শব্দ—এসব মিলেই গাঁয়ের ঘুম ভাঙে। মাঠে তখন কৃষকের কাঁধে লাঙল, কাস্তে হাতে নারীর দল, আর মুখে একরাশ গান।
এইসব গ্রামে এখনও মানুষ হাসে মন থেকে। অতিথি আসলে জল আনতে ছোটে উঠোনের কোণার মাটির কলসি থেকে। দুপুরে গাছতলায় বিশ্রাম আর বিকেলে হাটে যাওয়া—সবটাই যেন একটা নিয়ম মেনে চলে, যেটা শহর ভুলে গেছে বহু আগেই।
প্রায় সব গ্রামেই এখনও ঢোল বাজে রাতে, কেউ চৌ নাচে মুখোশ পরে। কারো কাছে এই মুখোশ শুধুই বিনোদন, কিন্তু এখানকার মানুষ জানে—এটা তাদের আত্মার উৎসব।
পুরুলিয়ার গ্রাম মানেই শুধু দরিদ্রতা নয়—এটা আত্মমর্যাদা, ঐতিহ্য, আর প্রকৃতির সাথে গভীর সম্পর্কের চিহ্ন। এই মাটিতে যারা থাকে, তারা শুধু চাষ করে না, তারা মাটির ভাষা বোঝে, গন্ধ চিনে নেয়। তারা জানে, কখন আকাশ দেখে বৃষ্টি আন্দাজ করতে হয়, কখন পাখির ডাক মানে ঝড় আসছে।
আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায়, এই গ্রামগুলো হয়তো কারো চোখে “পিছিয়ে পড়া”। কিন্তু আমি বলি—এরা হারিয়ে যাওয়া নয়, এরা হারিয়ে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি।
তাই আমি বেরিয়ে পড়েছি—এই গ্রামজীবনের মুখ, গল্প, রঙ, এবং আবেগকে তুলে ধরতে। পুরুলিয়ার এই পাথুরে জমিতে, এই সবুজে, এই ঘামের গন্ধে আমি খুঁজি এক অন্যরকম বাংলা।
তুমি সঙ্গে থাকো। কারণ এই যাত্রাটা শুধু আমার নয়—এটা আমাদের সকলের, যারা মাটির গন্ধ ভালোবাসে, যারা জানে ‘গাঁ’ মানে কেবল চারটে কুঁড়েঘর নয়, বরং এক অজেয় আত্মা।
এই ধরনের আরো পোস্ট দেখতে চাইলে একটা ফলো দিয়ে রাখো, আমি পুরুলিয়ার মাটির গন্ধ পৌঁছে দেবো ।
#পুরুলিয়া_গ্রামজীবন #গাঁয়েরগল্প #গ্রামীণবাংলা #পাহাড়_শাল_লোকসংস্কৃতি
পাশে আছি পুরুলিয়া
শুভ দুপুরের শুভেচ্ছা