creative captions by keya

creative captions by keya

Share

03/05/2026

প্রেমের পাঁচফোড়ন

( এখানে সকল পর্ব একসাথে দেওয়া হবে)

১)https://www.facebook.com/share/p/1B4ZomiMzx/

২)https://www.facebook.com/share/p/18YJhYTJQP/

৩)https://www.facebook.com/share/p/1GkNPa8N6W/

৪)https://www.facebook.com/share/p/1B2xUhbPL6/

চলবে.............🌷

03/05/2026

আমি শুধু চেয়েছি তোমাকে

(এখানে সকল পর্ব একসাথে দেওয়া হবে)

১)https://www.facebook.com/share/p/1JKhzWsGUp/

২)https://www.facebook.com/share/p/17CtT48f9G/

৩)https://www.facebook.com/share/p/1C6Nv2rFwm/

৪)https://www.facebook.com/share/p/1AvvRyQph3/

চলবে...........🌷

03/05/2026

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে

( এখানে সকল পর্ব একসাথে দেওয়া হবে)

১)https://www.facebook.com/share/p/18iB753puS/

২)https://www.facebook.com/share/p/1b2PUrhbTb/

৩)https://www.facebook.com/share/p/1DjvvuGcmC/

৪)https://www.facebook.com/share/p/1bRRfzDxGp/

চলবে...........🌷

02/05/2026

#আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়❤️‍🔥
পর্বঃ০৪
লেখনীতেঃsuraiya_rafa
🚫কপি করা নিষিদ্ধ।
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমনাদের জন্য।
বিঃদ্রঃ প্রথমত যারা ফিকশনের সঙ্গে হুবহু বাস্তবতা মিলাতে চেষ্টা করেন তাদের জন্য এই গল্পটি নয়। দ্বিতীয়ত এই গল্পে কোনো স্ট্রং পার্সোনালিটির নাইকার অস্তিত্ব নেই।

*
বাড়ির উঠোনে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের চিড়ল পাতার ফাঁক ফোকর গলিয়ে নিদারুণ বেড়িয়ে আসা মুঠো মুঠো রোদের হাতছানি, ধূসর মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে সেই কখন। সকাল থেকে দুপুর অবধি অবাধে আলোক রশ্মি ছড়ানো সেই চনমনে সোনালী রোদ মিলিয়ে গিয়ে নতুন উদ্যমে আষাঢ়িয়া বৃষ্টিতে ঝমঝম করে উঠেছে ভূবণ।

ঈশানীর ছোট্ট রুমের এক কোনে যে দক্ষিনের জানালাটা রয়েছে, ঠিক তার কোল ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে এক দানবাকৃতির বিশাল বড় জাড়ুল গাছ।গাছটা বোধ হয় ঈশানীর জন্মের আগে থেকেই এমন তাগড়া হয়ে বেড়ে উঠেছিল, তাইতো এখন বৃদ্ধ বয়সে মানুষের রুগ্নদেহের মতোই কেমন কুঁচকে গিয়েছে শরীরের ছাল-বাকল, ডালপালা সবকিছু। অথচ সেই ডালপালা দিয়েই চুইয়ে চুইয়ে বৃষ্টির ছাট এসে একেবারে প্লাবিত করে দিয়েছে ঈশানীর ঘরের সমগ্র মেঝে।

ওদিকে কিছু ঘন্টার জন্য পৃথিবীর সকল আয়োজন, সকল অনিরাপত্তা, দুঃখ কষ্ট ঝুট-ঝামেলা, সবকিছু বেমালুম ভুলে গিয়ে আপন মনে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে ঈশানী। মেয়েটা ধাক্কা খেয়েছে, কষ্ট ও পেয়েছে খুব, তবে বহিঃপ্রকাশ করার মতো ভাষা ওর জানা নেই। হয়তো-বা ওর দুঃখ কষ্টকে এতোটা গুরুত্ব দেওয়ার মতো মানুষের অস্তিত্বই নেই। আর নয়তো ঈশানী নিজেই নিজের জগতটাকে পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে । ঘরকুনো স্বভাবটা নিজের অজান্তেই একেবারে মনেপ্রানে ধারণ করে ফেলেছে মেয়েটা, এখন চাইলেও আর কারও কাছে মনের কথা ব্যক্ত করে নিজেকে হালকা করতে পারেনা ঈশানী।

ওর এই স্বভাবটা যে বরাবরই একগুয়ে ছিল তেমনটাও নয়। ঈশানীর যতটুকু মনে পরে, এই ঘরকুনো স্বভাব, পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখার আপ্রান প্রচেষ্টা, জন্ম সূত্রে পাওয়া অতিব সুন্দর নীল চোখকে নিজের অপাপ্তি মনে করা, এই সবকিছুই শুরু হয়েছিল ঈশানীর বাবার মৃ'ত্যুর পর থেকে।

ঈশানীর বাবার স্বাভাবিক মৃ'ত্যু হয়নি, ওর বাবা একজন সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন, যদিও তখন পরিস্থিতি বোঝার জন্য ঈশানীর বয়স খুবই কম ছিল, তবে ও নানীর মুখে শুনেছে, কোনো এক পার্বত্য অঞ্চলে পোস্টিং এ থাকাকালীন, দূধর্ষ , হৃদয়হীন কিছু অজ্ঞাত মাফিয়া টেরিটোরিস্টের সঙ্গে গো'লাগু'লির এক পর্যায়ে নৃ'শংস ভাবে নি'হত হন তিনি।

আসলে পার্বত্য অঞ্চলগুলো একদিকে যেমন অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রানকেন্দ্র,ঠিক তার বিপরীত দিকে নজর বোলালে,তেমনই নাম না জানা উঁচু নিচু পাহাড়ে ঘেরা বিস্তৃত জঙ্গলের আড়ালে একটা রহস্য বেষ্টিত ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার দিক ও রয়েছে বটে এর।

ফ্যান্টাসী বলে, সৌন্দর্যের পাহারাদার বরাবরই কুৎসিত আর ভ'য়ঙ্কর হয়। ব্যাপারটা কিছুটা তেমনই।
কারন সেই মেঘ ভেজা ঝর্ণা গায়ে মাখানো অকৃত্রিম রূপসী পর্বতমালার অন্ধকার রহস্য জন সাধারণ কিংবা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আহরন করতে আসা টুরিস্টদের দ্বারা কখনোই উন্মোচন করা সম্ভব নয়। তাই তো যুগের পর যুগ কেটে গেলেও, পর্বতমালা বেষ্টিত এই পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু নাম না জানা, কৌতুহলী,আর অন্ধকার দিক, পুরো দেশ বাসীর কাছে অজানাই রয়ে যায়। হয়তো কোনো না কোনো ভাবে জন সাধারনের মঙ্গলের জন্যই সরকারের এই অপারগ গোপনীয়তা।

সে যাই হোক, সেবার ঈশানীর বাবার এই অকাল মৃত্যুর পরেই এক ধাক্কায় কেমন ওলোট পালোট হয়ে যায় ছোট্ট ঈশানীর জীবনটা। এভাবে অকালে স্বামী হারানোর শোক যেন বানভাসি নদীর মতোই এফোড় ওফোড় যন্ত্রনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল মাত্র সতেরো তে মা হওয়া রোকেয়া কে। যার দরুন খুব অল্প বয়সে বিধবা তকমা গায়ে লেগেছিল বলে মায়ের পরামর্শ আর সব ভাইয়েদের সিদ্ধান্তে একমাত্র বোনকে একটুখানি সুখে থাকার প্রয়াসে দ্বিতীয়বারের মতো অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হয় ।

আর এদিকে নানীর হাত ধরে এই ছোট্ট দোতলা বাড়িটির এককোনে শুয়ে বসে দিবারাত্রি যাপন করে জীবন অতিবাহিত হতে থাকে নিঃসঙ্গ ঈশানীর। তখন থেকেই অবুঝ মেয়েটা কেমন গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। মুক্ত আকাশে অবাধে ডানা ঝাপ্টানো বুনো শালিকটা হুট করেই খাঁচায় বন্দী হলে যেমন নেতিয়ে পরে, ঠিক তেমন করেই বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পরেছিল আট বছরের ঈশানীর মন মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে । গায়ে পায়ে বয়স না বাড়লেও মনের বয়সটা তখনই যেন হু হু করে দিগুণ তালে বেড়ে যায় ওর।

তবে ঈশানীর একাকী নিঃসঙ্গ জীবনের ইতি টেনে বছর তিনেক পরেই, ওর মা রোকেয়া প্রাচী আবারও ফিরে এসেছিলেন বটে, কোনো এক অজানা কারণে রোকেয়া প্রাচীর দ্বিতীয় সংসার আর করা হয়ে ওঠেনি। তবে তিনি যখন ঈশানীর নিকট ফিরে এসেছিলেন তখন তার কোলে ছিল ছোট্ট দুধের শিশু ঊষা। যেহেতু ঈশানীর দাদা দাদি কিংবা সেভাবে নজর রাখার মতো অন্য কোনো আত্নীয় স্বজন ছিল না, তাই তখন থেকেই ঊষাকে নিয়ে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন রোকেয়া প্রাচী। কিন্তু যতদিনে রোকেয়া প্রাচী ফিরে এসেছিলেন, ততদিনে ঈশানী যেন নির্লিপ্তে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল স্রোতের বিপরীতে। ওর মাঝের পরিবর্তন গুলো ছিল স্পষ্ট দৃশ্যমান।

তখন পরিবার, মানুষের আনাগোনা, উচ্চস্বরে কথাবার্তা কোনোকিছুই আর ভালো লাগতো ঈশানীর। বরং এগুলোকে বিরক্তিকর ঝঞ্জাট আর বেহুদা মনে হতো ওর নিকট। তবে মেয়ের এই নিঃসঙ্গতা, অন্তর্মুখী স্বভাব পরিবর্তন করার জন্য রোকেয়া প্রাচীরও কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। কোনো এক অযাচিত কারনে তিনি ঈশানীর মাঝের এই ভীত সন্ত্রস্ত আর নিজেকে গুটিয়ে রাখা স্বভাবটা খুব কৌশলে পুষে রাখতে চাইতেন। যার দরুন আজ এতো বছর পরেও ঈশানীর হৃদয়টা সেই আট বছরেই আটকে আছে। নিজেকে সাহসী আর আত্নবিশ্বাসী প্রমান করতে গিয়ে বারবার বি'পদ আর লজ্জাজনক ঘটনার সম্মুখীন হওয়াটা ওর স্বভাবে পরিনত হয়েছে।

শুধুমাত্র এই ঘরমুখ স্বভাবের জন্যই স্কুল কলেজ সবখানে বন্ধুমহল তৈরিতে অক্ষম ঈশানী। যেখানে বন্ধুই নেই যেখানে প্রেমে পরার মতো দুঃসাহসী কাজ তো ওর জন্য কল্পনাতীত। ঈশানীকে যে কখনো কেউ প্রোপোজ করেনি এমনটা নয়, ওই জ্বলজ্বলে আকর্ষনীয় নীল চোখ দেখে পাগল না হয়ে উপায় আছে? চোখ তো নয় যেন মাদকে ঠাসা।

কিন্তু বিধিবাম! প্রেমের প্রস্তাবের চেয়েও তিরস্কার আর ভৎসনাটাই বেশি জুটেছে ঈশানীর কপালে। কেউ যদি ওকে প্রপোজ করতো, তখন ক্লাসের সবাই কানাঘুঁষা করে টিপন্নী কেটে বলতো,
--- ওকে প্রোপোজ করেছিস? মেয়েটা তো এক্কেবারে ডাম্ব,ঠিক ভাবে চোখে চোখ রেখে তাকাতে অবধি পারে না, সে নাকি করবে প্রেম? ওর সাথে প্রেম করে প্রেমিকের স্বাদ পাবি আদৌও?

অগত্যাই চারপাশের মানুষের নেতিবাচক কথায় বারংবার ধসে গুড়িয়ে যেতো ঈশানীর আত্মবিশ্বাসের পাহাড়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাউকে ভালোবাসার সাহস কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই জাগেনি ঈশানীর মনে।

আর আজ যখনই মনে হলো, অবশেষে কেউ হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসার বহর সাজিয়ে ওর নিকট আসতে চলেছে, যার কাছে ঈশানী নিজেকে মেলে ধরবে, নির্জীবতা ছাপিয়ে নিজের উষ্ণ হৃদয়টাকে যার হাতে নির্বিগ্নে তুলে দেবে, সেও ওকে বিয়ে না করেই, ওর মুখটা অবধি না দেখেই দূর দেশে পাড়ি জমিয়ে আরও একবার দুমড়ে মুচড়ে নষ্ট করে দিলো ঈশানীর একটু একটু করে তৈরি করা এতোদিনের আত্নবিশ্বাসী হৃদয়টাকে। আচ্ছা, মাহিন বেনজামিন যদি একটাবার ঈশানীর মুখটা দেখতো, তাহলে কি এভাবে বিয়ে না করে ফেলে চলে যেতে পারতো?

যদিও বা এই অধ্যায় এখানেই সমাপ্ত, তবুও অজ্ঞাত এই নিছক প্রশ্নটা রয়েই গেলো ঈশানীর মন মস্তিষ্ক জুড়ে।

*************************************************
---- কিরে এই সাত সকাল বেলা কোথায় যাচ্ছিস ব্যাগ নিয়ে?

সকাল সকাল লং কুর্তি আর স্কার্ফটা গলায় পেঁচিয়ে ব্যাগ সমেত নিচে নেমে এসে, ঘরের দুয়ারে বসে বসে ঈশানী যখন দক্ষ হাতে স্নিকার্সের ফিতে গুলো বাঁধছিল, তখনই পেছন থেকে কথা পারেন ওর মা রোকেয়া প্রাচী ।

পেছনে না ঘুরে জুতোর ফিতেয় হাত চালাতে চালাতেই শুকনো মুখে জবাব দিলো ঈশানী,
--- চিটাগং ফিরে যাচ্ছি।

মেয়ের কথা শুনে রোকেয়া বেগম কিছুটা অধৈর্য কন্ঠে বলে ওঠেন,
--- এখনই যেতে হবে কেন? আমি ঘটকের সঙ্গে কথা বলেছি উনি অন্যত্র ছেলে দেখছেন। তাছাড়া কাল বিয়ে ভেঙেছে, এই মূহুর্তে বাড়ি থেকে বের হলে মহল্লার মানুষই বা কি বলবে?

মায়ের কথায় চড়াৎ করে আ'গুনের হল্কার মতোই জ্বলে উঠলো ঈশানীর শান্ত হয়ে থাকা মেজাজটা। ভেতরের সব রাগ ক্ষো'ভ যেন নিংড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে ওর। কিন্তু ঈশানী তো চ্যাঁচামেচি পছন্দ করে না। তাই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে পেছনে ঘুরে মায়ের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
--- আমার বিয়ে হোক কিংবা না হোক মহল্লার মানুষ কোনোকালেই আড়ালে কথাবলা বন্ধ করবে না মা। কারণ এটাই তাদের স্বভাব। আর না তো আমার বিয়ে নিয়ে তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে। যতদিন অবধি বিয়ে না হচ্ছে ততদিন দরকার পরলে আমার এই মুখ দেখাবো না তোমাকে আমি, তবুও দয়াকরে এবার একটু স্বস্তি দাও আমাকে।

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো উগরে দিয়ে, ব্যাগ সমেত গটগটিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায় ঈশানী। ওদিকে মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে ক্ষুব্ধস্বরে হাঁক পেরে ওঠেন রোকেয়া,
--- মুখে মুখে তর্ক করছিস? মায়ের মুখে মুখে? আমিও দেখবো তোর দৌড় কতদূর, বিয়ে আমি তোকে দিয়েই ছাড়বো।

রেগেমেগে কথাশেষ করে তপ্তশ্বাস ফেলেন রোকেয়া। ওদিকে লাঠি ভর করে ঈশানীর নানী এগিয়ে এসে মেয়েকে ধমকের সুরে বলে ওঠেন,
---- আহা যাইতে তো,মাইয়াটার মন ভালো নাই, সব কিছু কি বাইন্ধা রাখা যায়? বাইন্ধা রাখতে গেলে পাখি আরও তাড়াতাড়ি ফুরুত হইয়া যায়, জানোস না হেইডা?

রোকেয়া প্রাচী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, মায়ের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে ক্লান্তস্বরে বলে ওঠেন,
--- তুমি কি জানোনা, এই বাড়িটা যে ঈশানীর নামে? আমি যদি আমার পছন্দমতো ছেলের হাতে ওকে তুলে দিতে না পারি, তাহলে তো সর্বনাশ মা। ও যদি নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করে, তাহলে তো বিয়ের ক'দিন পরেই ওরা আমাদের এই বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে, তখন আমার আর ঊষার কি হবে বলোতো?

মেয়ের কথায় বিরক্তি প্রকাশ পেলো ঈশানীর নানীর কপালের ভাঁজে, তিনি পুনরায় লাঠি ভর করে ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,
---- আমার ঈশু মোটেই এমন মাইয়া না, চুপ কর তুই।

মায়ের কথার বিপরীতে আর মুখ খুললো না রোকেয়া, শুধু বুক চিড়ে বের করে দিলো ভারী এক দীর্ঘশ্বাস।

*************************************************

গত দুদিন ধরে ভারী বর্ষনে তলিয়ে আছে রাস্তাঘাট। শহরের অলিগলিতে যানজটের বেহাল দশা। পুরো শহর ডুবে আছে প্রায় মিটার খানিক বদ্ধ পানির নিচে। সেই কর্দমাক্ত নোংরা পানি পেরিয়েই লোক সমাগম নিদারুণ ছুটে চলেছে আপন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে।

ঈশানীর অবশ্য এই নোংরা পানি পেরিয়ে আপাতত ক্যাফেতে ছুটতে হচ্ছে না। কারণ জয়া আন্টির শর্তানুসারে আগামী একসপ্তাহ বিনা কৈফিয়তে ছুটি কাটাবে ঈশানী। তাই বাড়ি থেকে ফিরে এসে এই ছোট্ট সিঙ্গেল ফ্ল্যাটটাতেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন রাত অতিবাহিত করছে ঈশানী। ঈশানীর মতে একা থাকা বড্ড সুখের। তাই সারাদিন ঘরের মধ্যে শুয়ে বসে থেকেও মন ফুরফুরে হয়ে আছে মেয়েটার।

তবে আশেপাশে নিঝুম থাকলে অন্যকথা। নিঝুম ওর স্বস্তি, আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে কম্ফোর্ট জোন। মাস ছয়েক আগে যখন শান্ত নিরিবিলি ঈশানী এই বাসাতে সাবলেট উঠেছিল, তখনই ওর পরিচয় হয়েছিল একটা প্রানোবন্ত হাসিখুশি শ্যামাবতীর সাথে। সেই চঞ্চলা উচ্ছ্বাসিত মেয়েটাই ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় ঘরকুনো বন্ধুহীন ঈশানীর সবচেয়ে কাছের মানুষ বলো বন্ধু বলো দুটোতেই পরিনত হয়েছে।

ভরসন্ধ্যা বেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঈশানী যখন একমনে হিজিবিজি ভাবছিল, ঠিক তখনই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ শোনা গেলো।
সাধারণত ভার্সিটি টিউশন শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায় নিঝুমের, কিন্তু আজ সে ফিরলো সন্ধ্যা বেলাতে।
ঈশানী গিয়ে তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দিতেই নিঝুম একগাল হেসে বলে উঠলো,
--- সারপ্রাইজ মাই লেডি।

নিঝুমের সারপ্রাইজে উত্তেজিত হতে দেখা গেলোনা ঈশানী কে, বরং ওকে ভেতরে আসতে বলে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে ঈশানী শুধালো,
--- আজ এতো তাড়াতাড়ি ফিরলি যে?

নিঝুম ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু শেষ দিয়ে বলে,
--- কারণ আছে।

--- কি কারণ?

নিঝুম চোখ বড়বড় করে উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলে ওঠে,
--- আজ টিউশনি করাই নি, কারণ আজ হবে অনলি গার্লস নাইট।

ওর কথার আগামাথা বুঝলো না ঈশানী, অগত্যাই ঠোঁট উল্টে শুধালো,
--- মানে কি?

--- মানে হচ্ছে আমরা আজ সারারাত কাথা মুড়ি দিয়ে মুভি দেখবো, বৃষ্টি বিলাশ করবো তারপর ভোর বেলা ঘুমাতে যাবো, কারণ কাল তো উইকএন্ড।

ঈশানী ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
--- বুঝলাম।

--- এতো বুঝলে হবেনা, যা গিয়ে পপকর্ন ভেজে নিয়ে আয়, আমি এক্ষুনি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

কথাশেষ করে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে চলে যায় নিঝুম। আর এদিকে ঈশানী ব্যস্ত হয়ে পরে একমাত্র বান্ধবীর আবদার মেটাতে।

*
ঘরের দরজা জানালা পর্দা সব লাগিয়ে দিয়ে পুরো রুমটাকে থিয়েটার বানিয়ে, ম্যাচিং করে পোকেমন ওভার সাইজ টিশার্ট, থ্রী কোয়ার্টার লেগিংস আর চুলগুলো চুড়ো করে বেধে, ঈশানী আর নিঝুম বসে পরেছে ল্যাপটপের সামনে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে টাইটানিক মুভি চলছে, এই মুভি দেখে দেখে বিরক্ত ঈশানী, তবুও দেখতে হয়, কারন টাইটানিক নাকি নিঝুমের ফেবারিট মুভি।

এই মুভি দেখে কত হাজার বার যে কেঁদেছে মেয়েটা তার ইয়ত্তা নেই। ঈশানী ভেবে পায়না এক মুভি দেখে মানুষের ঠিক কতবার কান্না পায়? মেয়েটাকে তো আর কম বুঝায়নি ও যে, এই মুভির শুটিং সুইমিং পুলে করা হয়েছে সত্যিকারে কেউ ম'রেনি, সবাই বেঁচে আছে ভাই। কিন্তু কে শোনে কার কথা, নিঝুম মেয়েটা সেই শেষ সিনে এসে কাঁদবেই কাঁদবে। কারণ ওর নাকি বিচ্ছেদ একদম সহ্য হয়না, ম'রে যেতে ইচ্ছে করে। বাস্তবে কখনো বিচ্ছেদের তিক্ততা অনুভব করলে এই মেয়ে যে আদতে কি করবে, কে জানে?

নিঝুমের কথা ভেবে কুল পায়না ঈশানী, ওদিকে নিঝুম পপকর্ণ চিবুতে চিবুতে পর্দায় চলতে থাকা জ্যাক আর রোজের ক্যামিষ্ট্রি দেখিয়ে আপসোসের সুরে বলে ওঠে,
--- ইশ আমি যে কবে একটা প্রেম করবো৷ আমার জীবনে কবে যে এমন একটা জ্যাক আসবে?

ঈশানী ঘাড় ঘুরিয়ে মৃদু হেসে বললো,
--- ভার্সিটিতে পড়িস, ছেলেদের তো আর অভাব নেই, করলেই পারিস।

নিঝুম চোখ মুখ কুঁচকে মুখটাকে বাংলার পাঁচের মতো করে বললো,
--- ধূর, বললেই কি আর প্রেম হয় নাকি? তাছাড়া আমি যে কেমন ছেলে চাই, সেটা তো আমি নিজেই জানিনা।

কথা বলতে বলতে চট করেই নিঝুম ঈশানীকে শুধালো,
--- আচ্ছা ঈশু, তুই কখনো প্রেমে পরিস নি?

ঈশানী এবার মুচকি হেসে আসন দিয়ে বসলো, অতঃপর ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে নিস্প্রভ চোখে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো ,
--- প্রেমে পরতে হয় বলে পরা, সেরকম প্রেমে আমি কোনোদিনও পরতে চাইনা নিঝুম, আমি চাই আমার প্রেমে পরাটা হোক ঘূর্নিঝড়ের গতিপথ পাল্টে যাওয়ার মতোই হুট করে। যাকে এক দেখাতেই আমার হৃদস্পন্দন গতি হারাবে, ভেতরের সুপ্ত অনুভূতিরা মাথা চাড়া দিয়ে একযোগে বিদ্রোহ করে উঠবে, প্রেমে পড়ার নিদারুণ য'ন্ত্রনায় নীল হয়ে উঠবে আমার হৃদয়। তাকে আমার মস্তিষ্কে নয়,বরং মানস্পটে আটকাতে হবে ।শরীরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছাপিয়ে যাকে আমি শুধুমাত্র অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারবো। যাকে না দেখতে পেয়ে আমি পা'গল পাড়া হয়ে যাবো। আমার শরীর মন, এমনকি সমগ্র অস্তিত্ব তাকে পাওয়ার জন্য আকষ্মিক আন্দোলন করে উঠবে। ঠিক এমন ভাবেই প্রেমে পড়তে চাই আমি নিঝুম। আর আমি এও জানি, পৃথিবীতে এমন কারও অস্তিত্বই নেই যাকে দেখে কিনা আমার হৃদয়ে এমন অনুভূতির ঝড় উঠবে।

ঈশানীর প্রেমে পরার ব্যাখা শুনে, নিঝুম এদিকে ওদিক অপারগ মাথা নাড়িয়ে আপসোসের স্বরে বলে উঠলো,
---- বুঝেছি, তুই নিজের মাঝে প্রেমের সুখ নয় বরং প্রেমের বি'ষ ধারণ করতে চাইছিস। এই জন্যই বলি ফ্যান্টাসী ফিকশন গুলো একটু একটু কম কম পড়।

আজ বহুদিন বাদে নিঝুমের কথা শুনে হো হো করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো ঈশানী। যেন নিঝুম মাত্রই আস্ত একটা জোক্স শুনিয়েছে ওকে। প্রেমের বি'ষ সেটা আবার কি জিনিস? অথচ সবচেয়ে ফানি জোক্স শুনেও মেয়েটা কখনো এভাবে হাসেনা। সাইকোলজি বলে, যখন কেউ অকারণেই খুব হাসে, তার মানে সে বড্ড একা, তার ভেতরটা অজস্র দুঃখে কলুষিত। সেই ভেবেই ঈশানীর হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে চেয়ে একটুখানি ব্যথাতুর হাসলো নিঝুম।
*
দুজনার গল্প আর আড্ডায় বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে যায়, তখনও মুভি চলছিল। নিঝুম শেষ সিনে নাক টেনে টেনে কেঁদে ভাসাচ্ছে, আর ঈশানী ওর দিকে টিশ্যু এগিয়ে দিচ্ছে, ঠিক এমন সময় তারস্বরে ফোনটা বেজে ওঠে ঈশানীর। জিসান কল দিয়েছে, নিঝুম যেহেতু কান্নাকাটি করছে তাই একটু দূরে গিয়েই ফোনটা রিসিভ করলো ঈশানী। ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে কথা শুরু করে জিসান, শান্তস্বরে বলে ওঠে,
--- কেমন আছি ঈশা?

--- হুম ভালো, তুই?
আস্তে করে জবাব দেয় ঈশানী।

--- ভালো আছি, চিটাগং ফিরেছিস তাও কাজে আসছিস না যে?

--- আমি ছুটি নিয়েছি জিসান, আগামী একসপ্তাহ আসবো না।

--- বাহ! দারুণ তো,
চট করেই মুখের উপর কথাটা বলে ওঠে জিসান।

জিসান কে অমন হুট করেই খুশি হয়ে যেতে দেখে ঈশানী বলে ওঠে,
--- দারুণ মানে?

জিসান এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো,
--- শোন তাহলে,কাল তো ছুটির দিন আর আমি একদিন বাড়িয়ে ছুটি নিয়েছি, আমাদের ভার্সিটি থেকে কাল সবাই খাগড়াছড়ি যাচ্ছে, হাইকিং এ, তোকেও নিয়ে যাবো সাথে।

খাগড়াছড়ি নামটা শোনা মাত্রই অকস্মাৎ সেদিনের সেই কালো হুডি পরিহিত অপরিচিত লোকটার পিয়ার্সিং করা রিং বসানো শূন্য ডমিনেটিং ধূসর বাদামী চোখজোড়া ভেসে উঠলো ঈশানীর মানস্পটে। যে ওকে সেদিন অমন ঝড়বৃষ্টির রাতে একটা বড়সড় বি'পদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। যদিও বা লোকটার চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি ঈশানী, তবুও কোথাও যেন মনে হয়েছিল এই লোকটা দেখতে মারাত্মক সুদর্শন আর স্টাইলিশ। যার সামান্য ভ্রু তে এতো সুন্দর স্টাইল করে রিং বসানো থাকতে পারে সে নিশ্চয়ই অনেক বেশি রুচিশীল আর আধুনিক মন মানসিকতার?

--- কিরে কিছু বল?

জিসানের রাশভারি আওয়াজে ধ্যান ভেঙে যায় ঈশানীর, কি থেকে কিসের ভাবনায় চলে গেলো ও আশ্চর্য, অতঃপর নিজের ফোকাস ফিরিয়ে এনে,স্পষ্ট আওয়াজে ঈশানী বলে,
---- আমি কোথাও যাবোনা জিসান, তোরা যা।

--- কেন যাবি না? ভ'য় পাচ্ছিস?

--- কিসের ভয়? আশ্চর্য!

--- এই যে বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ি রাস্তায় হাইকিং।

ঈশানী এবার বিরক্তির স্বরে বললো,
--- না আমি ভয় পাঁচ্ছি না, তুই আমাকে যতটা ভীতু আর সহজ সরল ভাবিস আমি ততটাও ভীতু নই জিসান।

--- তাহলে যাবি না কেন?

--- আমার ভালো লাগছে না তাই যাবোনা।

জিসান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঈশানীকে মানানোর চেষ্টা করে সহজ গলায় বললো,
---- একবার গিয়েই দেখ না, আই সয়ার বর্ষাকালে পাহাড়ি সৌন্দর্যে পাগল হয়ে যাবি তুই, মনটা একদম ফ্রেশ হয়ে যাবে,বারবার মনে হবে এমন পরিবেশ উপভোগ করার জন্য হলেও আরও একশো বছর আয়ু বাড়ুক আমার।

জিসানের মুখে এমন পাহাড়ি বর্ণনা শুনে ঈশানীর মনে কি একটুও হাইকিং করার লোভ জাগেনি? জেগেছে তো, কিন্তু ওর সমস্যা টা তো অন্য যায়গায়, তাই এবার আর কপটতা নয়, বরং সরাসরিই বলে দিলো ঈশানী,
--- দেখ জিসান, আমি জানি বর্ষাকালে পাহাড় কতোটা সুন্দর হয়, কিন্তু তোর ভার্সিটির বন্ধু বান্ধবদের তো আর আমি চিনিনা তাইনা? তাহলে ওদের সাথে কি করেই বা সাচ্ছন্দ্য বোধ করবো আমি, তুইই বল? আর আমি যদি সবার সাথে মিশতেই না পারি তাহলে হাইকিং করার আনন্দটা আর পেলাম কই?

জিসান তৎক্ষনাৎ ঈশানীকে আস্বস্ত করে বললো,
--- তোর কারও সাথে মিশতে হবে না ঈশানী, এমনকি মেশার চেষ্টা ও করতে হবে না, আমি আছি তো।

জিসানের কথায় চিড়বিড়িয়ে উঠলো ঈশানী,বললো,

--- কতবার বলেছি আমার ক্ষেত্রে একদম নিজের গার্জিয়ান গিরি দেখাতে আসবি না তুই। আমি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারি।

ঈশানীর কথায় চোখ জোড়া বড়বড় হয়ে গেলো জিসানের, ও অবিশ্বাস্য স্বরে বলে ওঠে,
--- তারমানে কি তুই যেতে রাজি হয়েছিস?

--- মোটেই না, আমি তো শুধু তোকে বোঝালাম যে আমি ভীতু নই, চাইলেই যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারি আমি।

--- তাহলে চল আমাদের সাথে, তুই তোর মতো থাকবি, কেউ তোকে ডিস্ট্রাব করবে না, আই প্রমিস।

--- এতো কথা ভালো লাগছে না আমার জিসান।যাবো না বলেছি তো?

জিসান এবার কথার মাঝে একটু খানি কৌশল খাটালো, কারণ ও জানে ঈশানী আত্মবিশ্বাসী হতে চায়। তাই হুট করেই বলে ওঠে,
---- আমি তোকে ডেয়ার দিলাম ঈশা, তুই যদি এবার আমাদের সাথে না যাস, তাহলে তুই সত্যিই একটা ভীতুর ডিম।

ঠিক এই কথাতেই কাজ হলো,জিসানের কথাটা বড্ড মানে লাগলো ঈশানী, তাই কিছুক্ষন নীরব থেকে আচমকা ঈশানী বলে ওঠে,
--- ডেয়ার একসেপ্টেড।এবার খাগড়াছড়ি গিয়ে হাইকিং করে সবার আগে পাহাড়ে উঠে আমিও দেখিয়ে দেবো তোকে, যে আমি আদতে কতোটা সাহসী।

অবশ্য মুখে এ কথা বললেও ভেতর ভেতর ঠিকই একঝাঁক জরতা আর ভয় এসে ইতিমধ্যে খামচে ধরেছে ঈশানীর কলিজাটা। কিন্তু ভয় কে তো জয় করতেই হবে। সাহসীকতার প্রশ্ন বলে কথা, ঈশানীকে তো খাগড়াছড়ি যেতেই হবে এবার।

************************************************
পরের দিন যথাসময়ে চট্টগ্রাম বায়েজিদ বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছায় ওরা সকলে।

জিসান ঈশানীকে ওর বাসার নিচে থেকে এগিয়ে নিয়ে তবেই এসেছে, পুরো একটা বাস ভর্তি মানুষ খাগড়াছড়ি যাচ্ছে ওরা, সেখানে ঈশানীই একমাত্র মানুষ যে কিনা জিসান ছাড়া কাউকে আর চেনেনা, কাউকে চেনার আগ্রহ ও অবশ্য ওর মাঝে নেই। ব্যাপারটা ভীষণ অসহিষ্ণু। তবুও খুব করে সবার মাঝে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর নিদারুণ চেষ্টা চালাচ্ছে ঈশানী।

আজ সকাল থেকে আবহাওয়াটা গুমোট হয়ে আছে, আকাশ ফুটো হয়ে ঝিরঝির করে ঝড়ে পরছে বারিধারা। তবে এই বৃষ্টি গায়ে লাগার মতো নয়, বরং ধূসর রাঙা এই শীতল আবহাওয়াটাই দারুণ উপভোগ্য, যেহেতু ওরা হাইকিং এ যাবে, তাই অতি ভোর বেলাতেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে দিয়েছে ওদের। বাস ছেড়ে দিতেই বাসের টিন্ডেট জানালার কিছু অংশ খুলে দেয় ঈশানী, সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ভেজা এক নিদারুণ দমকা হাওয়া এসে আঁচড়ে পরে ওর মুখ মন্ডলে,আর তৎক্ষনাৎ পরম আবেশে দু'চোখ বন্ধ করে নেয় ঈশানী, অতঃপর ধীরে সুস্থে বুক ভরে বাতাস গ্রহন করে। এই সজীব বাতাসটুকু বোধ হয় ওর দরকার ছিল, তাই মনেমনে ওকে নিয়ে আসার জন্য জিসানের উপর খুশিও হয় অনেকটা।

ঈশানী যখন প্রকৃতির মাঝ থেকে স্নিগ্ধতা আহরণ করে নিজেকেই নিজে বিনোদন দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ওর পাসের সিটে এসে বসে পরলো পাতলা সিমসাম গড়নের একটা সুন্দরী মেয়ে, কারও উপস্থিতি টের পেয়ে ঈশানী ঘুরে তাকাতেই মেয়েটা হাত বাড়িয়ে করমোর্দন করার প্রয়াসে সম্মোহনী হাসি দিয়ে বলে ওঠে,
--- হাই, আমি মৃণা মানে মৃণালিনী,জিসান আমার ভালো বন্ধু, নাইস টু মিট ইউ।

ঈশানীও সহসা হেসে হাত মেলালো মেয়েটার সঙ্গে, অতঃপর বললো,
--- আমি ঈশানী, ঈশানী তুজ কর্ণিয়া। নাইস টু মিস ইউ ঠু।

মেয়েটা গল্প করার আশে কথা এগোতে শুরু করে এবার। আগ বাড়িয়ে বলে,
---- জানো আমরা এখানে বেশির ভাগই কাপল, ওই যে দেখছো ওটা আমার বয়ফ্রেন্ড।তুমি আর জিসান ও নিশ্চয়ই?

মৃণার ঘোরানো কথার মানে বুঝতে পেরে, তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো ঈশানী,

--- মোটেই না, জিসান আর আমি ভালো ফ্রেন্ড সাথে কো-ওয়ার্কার। কিন্তু এ কথা তোমাকে কে বলেছে? নিশ্চয়ই জিসান?

কথা শেষ করে কয়েক সিট পেছনে বসে মোবাইলে গেইম খেলতে থাকা জিসানের পানে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঈশানী। মৃণা মেয়েটা নিজের বোকামি কথার ভুল ধরতে পেরে ঈশানীকে বুঝিয়ে বলে,
--- থাক ঈশানী, হয়তো জিসান এতোগুলো কাপলের মাঝে নিজেকে আন কম্ফোর্টেবল ফিল করছিল, তাই ওভাবে বলেছে, তুমি কিছু মনে করোনা।

মৃণার কথায় জোরপূর্বক হাসলো ঈশানী।

ঈশানী আর কিছু বলছে না দেখে মৃণা ওকে চিয়ার আপ করার জন্য পুনরায় বলে,
---- দেখো বাইরের প্রকৃতি কি সুন্দর। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গাছগাছালির সবুজ যেন তার চিত্ত চিড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে, এবারের হাইকিং এ নিশ্চয়ই আমাদের জন্য নতুন আর এডভেঞ্চার কিছু অপেক্ষা করছে, আ'ম সো এক্সাইটেড। উফফ!

মৃণার কথায় আবারও বিমর্ষ হয়ে যাওয়া মনটা ফট করেই ফুরফুরে হয়ে যায় ঈশানীর। তৎক্ষনাৎ মৃণাকে এক টুকরো মৃদু হাসি উপহার দিয়ে চলন্ত প্রকৃতির দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে বিড়বিড়ায় ও,

---- তাই যেন হয়।
চলবে.....

(বিঃদ্রঃ আমি জানি ঈশানীর নানীর কথাগুলো কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষা হওয়া উচিৎ, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো অনেকেই সেই ভাষা বুঝতে পারবে না, তাই random একটা আঞ্চলিক ভাষা দিয়েছি, কোনো স্থান কাল ভেদে দিইনি।)

02/05/2026

প্রেমের পাঁচফোড়ন💖
#পর্ব_৪

🌸
রিয়াজ সূর্যের কানে ফিসফিসিয়ে বললো এই মাইয়া এখন আমাদের বলবে -
,,,রিয়াজু তোমরা একটু ওদিকে যাও না,,,
,,,শান্তর সাথে কথা বলবো যেগুলো ছিল পাওনা,,,
নওশাদ ফিক করে হেসে দিলো রিয়াজের কবিতা শুনে
এলিনা শান্তর গালে হাত বুলিয়ে মুখটা ছোট করে বললো তোমাকে নাকি কোথাকার কোন মেয়ে চড় মেরেছে?
শান্ত বলতে চায়নি তাও এলিনার জোরজবরদস্তিতে বললো হুম
কে?কিসে পড়ে,তার ক্লাস রুম কোনটা?আমাকে দেখিয়ে দাও
বাদ দাও এলিনা,তোমার ক্লাস শুরু হবে যাও ক্লাসে যাও পরে কথা হবে
না তোমাকে বলতেই হবে,আমি জাস্ট মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করবো তার এত সাহস আসলো কই থেকে
রিয়াজ মুখ ফসকে বলে দিলো ফার্স্ট ইয়ার,গ্র্যান্ড ফ্লোর
ব্যাস এলিনা সেদিকে ছুটলো
শান্ত রেগে গিয়ে বললো কেন বলতে গেলি?scene create করবে এখন,আমার সমস্যা আমি সমাধান করতাম তুই ওরে বলতি গেলি কেন?এখন পুরো ভার্সিটি মাথায় তুলবে
আরে দেখিস এখন এলিনা ঐ মেয়েটার কিমা বানাবে,চল দেখবো,মাইয়া মাইয়ার মধ্যে ঝগড়া দেখমু,মাইয়া মাইয়া চুল টানাটানি দেখতে সেই লাগে😁
রিয়াজ আর সূর্য এলিনার পিছন পিছন গেলো দেখতে
শান্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ক্যামপাসে,মাথার উপরে থাকা সূর্যটা কিরন দিচ্ছে খুব রেগে,এত রেগে আছে সূর্যটা সে পারতেসে না নিচে নেমে শান্তর মাথার সাথে লেগে কিরন দেয়
ঝামেলার ভিতরে আরেক ঝামেলা!
এলিনা রুমে ঢুকে চিৎকার করে বললো শান্তকে কে চড় মেরেছিলা?
সবাই চুপ করে এলিনার দিকে তাকিয়ে আছে
একজন এলিনাকে দেখিয়ে দিলো আহানার দিকে আঙ্গুল তুলে
এলিনা এগিয়ে এসে আহানার হাত ধরে ওকে বেঞ্চ থেকে টেনে উঠালো
আহানা বুঝলো এটা হয়ত শান্তর জিএফ হবে
তারপর সে বললো কে আপনি?আমার হাত ছাড়ুন,এমন বিহেভ করতেসেন কেন?
কে আমি?তোর এত বড় সাহস আমার লাভারের গায়ে হাত তুলিস,আমি ওকে আজ পর্যন্ত একটা ফুলের টোকাও দিই নাই আর তুই কিনা ওকে চড় মারলি?
জানতি না ও কে?শান্তকে চিনস না তুই?বেয়াদব মেয়ে কোথাকার!
এলিনা একটা ধাক্কা দিয়ে আহানাকে নিচে ফ্লোরে ফেলে দিলো
আহানা কিছু বলতেও পারছে না,আসলেই দোষটা ওরই,না জেনে ঐদিন শান্তকে চড় মেরেছিল সে
এলিনা ওর হাত টেনে ধরে আবারও উঠালো নিচ থেকে,তারপর আহানার হাত মুচড়ে ধরলো
আহানা এলিনার সাথে পেরে উঠছে না,শুধু বলতেসে আমি ইচ্ছে করে করি নাই,আমি জানতাম না সত্যি!
নতুন এই ভার্সিটিতে পা রাখতে না রাখতেই এত বড় সাহস দেখালি তুই,আমার শান্তকে চড়??তোর গাল আমি ফাটায় দিব মারতে মারতে
এলিনার হাতের চাপে আহানার হাতের কাঁচের চুড়ি ভেঙ্গে নিচে পড়তেসে সব এক এক করে
শেষে একটা হাত এসে এলিনার হাত ধরে আটকালো
এলিনা চমকে পিছন ফিরে দেখলো শান্তকে
এলিনা!এসব কি করতেসো তুমি?ছাড়ো ওর হাত
শান্ত এলিনার হাত ছাড়িয়ে নিলো আহানার হাতের থেকে
আহানার নিচের দিকে তাকিয়ে একটু সরে দাঁড়ালো,হাতে ব্যাথা পেয়েছে অনেক,চুড়ি ভাঙ্গার কারনে হাত কাটা গেছে তাই ব্যাথাটা পেয়েছে সে
শান্ত নিচে তাকিয়ে দেখলো চুড়ি সব ভেঙ্গে চুরে পড়ে আছে
আর আহানা নিজের কাটা হাত লুকিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে,ক্লাসের সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে,শান্ত এক ধমক দিয়ে বললো
কি নাটক হচ্ছে এখানে?সবাই সবার কাজ করো
শান্তর ধমকে সবাই যে যার কাজে মন দিলো
শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এলিনাকে নিয়ে বেরিয়ে চলে গেলো ক্লাসরুম থেকে
আজ রুপা আসেনি,ক্লাসের এক কোণায় বসে আছে আহানা,জামাটা মুঠো করে ধরে
আমারই দোষ,সেদিন আমি ঐ ছেলেটাকে না বুঝে না মারলে এত কিছুই হতোই না,সব আমার দোষ
হাতের চুড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ে আছে,শখ করে এক টাকা এক টাকা জমিয়ে ৩০টাকা মিলিয়ে চুড়ি গুলো কিনেছিল সে

মেয়েটাকে চড় মারলে আমার কষ্ট যেতো,আমার বেবিকে মারে কত বড় সাহস,আর তুমিও বলিহারি কিছু বললেও না ওকে উল্টা আমার হাত আটকালে?
শান্ত ক্লাসরুমের দিকে তাকিয়ে আছে,এলিনা ধাক্কা দিতেই হুস আসলো তার
চারিদিকটা কেমন ঠাণ্ডা পরিবেশ হয়ে গেছে,এই ঠাণ্ডা হওয়ার কারনটা হলো কিছুক্ষন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা
কি হলো কিছু তো বলো!
মেয়েটাকে এত নরমালি handle করছো কেন?তুমি না পারলে আমাকে বলো আমি টাইট দিয়ে দিব
না থাক,আমি অলরেডি টাইট দিচ্ছি,কাল কিছু ফ্রেন্ডকে দিয়ে পানি ২বালতি ঢেলে দিসিলাম ওর গায়ে
এলিনা হেসে বললো বেশ করেছো,আমি হলে পুকুরে চুবাইতাম
ওহ হ্যাঁ আমি তো বলতে ভুলেই গেসিলাম কাল তো ভার্সিটি থেকে পিকনিকে যাবে সবাই
শান্তর সেদিকে খেয়াল নেই কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ক্যামপাসের ঘাসগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে সে,একদিকে মেয়েটার প্রতি রাগ আরেকদিকে মেয়েটার সেই অসহায় মুখ,দোটানায় পড়ে গেছে সে
রিয়াজ লাইব্রেরি থেকে এসে শান্তকে বললো শশী ম্যাম ডাকতেসে তোকে
শান্ত এলিনাকে বাই বলে ম্যামের কাছে গেলো
আসবো ম্যাম?
হুম আসো,কিছু কাজ আছে তাই তোমাকে ডেকেছি,জানো তো কাল সবাই পিকনিকে যাবে?
ইয়েস ম্যাম
ম্যাম তার হাতের ২পৃষ্ঠার একটা শিট ধরিয়ে দিলো শান্তর হাতে
শুনো শান্ত এখানে পিকনিকে যারা যারা যাবে তাদের নাম লিস্ট করা আছে,তুমি ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে গিয়ে বলবে সবার নাম আছে কিনা,নামগুলো পড়ে শুনাবে
শান্ত মাথাটা ঝাঁকিয়ে হাঁটা ধরলো,উফ আর কি স্টুডেন্ট ছিল না আমাকেই কেন এই দায়িত্ব দিতে গেলো,এমনিতেও মন মেজাজ ভালো না

শান্ত ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে ঢুকে এক হাতে শিটটা নিয়ে আরেক হাত পকেটে ঢুকিয়ে মুখটা গম্ভীর করে বললো
Attention everyone!
এটা বলার আগেই দেখলো আগে থেকে সবাই ওর দিকে হা করে চেয়ে আছে
শান্ত মুখের চুইংগামটা এক পাশ করে নিয়ে এক এক করে লিষ্টের সব নাম পড়ে বলতে লাগলো
আহানা খাতায় একটা রচনা লিখতেসিলো তখন,শান্তর মুখে আহানা নাম শুনে আহানা চমকে তাকিয়ে রইলো শান্তর দিকে,সবার শেষের নামটি আহানার ছিল,আহানা তো নাম দেয় নি,১২০০টাকা ছিল পিকনিকের ফিস তাই সে নাম দেয়নি তার কাছে এত টাকা নেই,তাহলে টাকাটা দিলো কে?
শান্ত যতজনের নাম নিসে তাদের মধ্যে যারা মেয়ে ছিল তারা তো বুকে হাত দিয়ে অজ্ঞান হওয়ার মত অবস্থা,শান্ত তাদের নাম নিসে এটার চাইতে ধুকবুক আলা ফিলিং আর কি হতে পারে!
শান্ত কাগজটা পকেটে ঢুকিয়ে হেঁটে চলে গেলো কারোর দিকে আর তাকালো না,তাকানোর মুড নাই,কেন তাকাবে?এদের কারোর প্রতি তার কোনো interest নেই,এলিনার প্রতি ও না
এলিনা হুদাই গায়ে লেগে পড়ে থাকে,প্রেম ভালোবাসা শান্তর একদম পছন্দ না,আসলে সে জানেও না প্রেম কি ভালোবাসা কি!!
চুপচাপ চলে গেলো সে
আহানা বসে ভাবতেসে ফিস কে দিলো
তখনই আহানার ফোন বেজে উঠলো,আহানা ফোনটার দিকে তাকিয়ে দেখলো রুপার কল,রিসিভ করতেই সে বলে উঠলো সারপ্রাইজ!
আমি পিকনিকের লিস্টে তোর নামটা দিয়া দিসি আর ফিস ও দিয়া দিসি,আমি জানতাম তুই ফিস দেওয়ার ভয়ে যাবি না,তোকে ছাড়া মজা পাবো না তাই ফিসটা আমিই দিয়ে দিলাম,তোকে তো আমি নিয়েই ছাড়বো
আহানার মন খারাপ হয়ে গেলো,কারন কাল পিকনিকে গেলে একটা টিউশনি ও করাতে পারবে না সে
টিয়ার মা স্যালারি কেটে নিবে,ভাবতেই কান্না পাচ্ছে আহানার,কিছু করার ও নেই রুপা তো টাকা জমা দিয়ে দিসে
আহানা মিথ্যা হাসি দিয়ে thanks বললো রুপাকে
রুপা বললো কাল রেডি হয়ে ভোর ৫টায় ভার্সিটির সামনে এসে পৌঁছাতে
শান্তকে প্রতিবারের মত গ্রুপ লিডার বানানো হয়েছে,তার সাথে রিয়াজ আর সূর্য ও গ্রুপ লিডার,একটা বক্সে সব গ্রুপের নাম আলাদা করে লিখে রাখলেন শশী ম্যাম
শান্ত,সূর্য আর রিয়াজকে বললেন কাগজ চুজ করতে
শান্ত বক্সে হাত ঢুকিয়ে যে কাগজটা বের করলো তাতে লিখা ছিল ফার্স্ট ইয়ার
এলিনা রেগে বললো ধুর!
সেকেন্ড ইয়ার হলে আমার বাসে তুমি উঠতে পারতা,আমাদের কপালটাই খারাপ,ওকে সমস্যা নেই,বাস থেকে নামলে তো আমরা আবার একসাথে থাকবো তাই না?
হুম
নওশাদ বললো শান্ত ভাই দেখ ঐ মেয়েটা যাচ্ছে যে তোকে চড় মেরেছিল
আহানা ভাবতে ভাবতে চলে যাচ্ছে টিয়ার মা তো নির্ঘাত ৫০০/৬০০টাকা কেটে রেখে দিবে,রুপা কেন যে আমাকে না বলে ফিস দিতে গেলো
হঠাৎ করে সামনে শান্ত এসে দাঁড়ালো আহানার পথ আটকিয়ে
আহানা ভয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে একটু সরে দাঁড়ালো
আর কোনোদিন আমার সামনে দিয়ে এমন ঘুরঘুর করবা না বুঝছো?তোমাকে দেখলেই আমার চড়ের কথা মাথায় আসে,এত ঘুরঘুর করলে তোমাকে আমি একদিন সিরিয়াসলি চড় মেরে দিব
আহানা চোখ তুলে তাকিয়ে বললো চড় মেরেছি বলে কি মাথা খাবেন আমার?কাল ২বালতি পানি দিয়ে ভিজিয়ে শান্তি হয় নাই আপনার?আপনার মা বাবা এই কারনে আপনার নাম শান্ত রাখসিলো?শান্ত না ছাই
শান্তর মেজাজ গেলো গরম হয়ে,হাত বাড়িয়ে আহানার হাত চেপে ধরে টান দিয়ে বললো কি বললে তুমি?আমার মা বাবা আমার নাম না জেনে দিসে?তোমার সাহস হয় কি করে তাদের নিয়ে কথা বলার?How dare you!
আহানার হাতে যে চুড়িটা ছিল সেটাও এখন ভেঙ্গে গেছে
আহানা বলতেসে ওর হাত ছেড়ে দিতে শান্ত ছাড়তেসেই না ওর মা বাবা নিয়ে কথা না বললেও পারতো আহানা,তাদের নিয়ে বলায় শান্তর মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেসে
তুমি আসলেই একটা বেয়াদব মেয়ে!
কথাটা বলে শান্ত আহানার হাত ছুঁড়ে ফেলে দিলো
আহানা তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো সকালের যে রক্ত শুকিয়ে গেসিলো সেটা আবার তাজা হয়ে গেছে
আহানা ব্যাথা পেয়ে শান্তর দিকে তাকিয়ে রেগে বললো আপনিও তাহলে একটা বেয়াদব!
আপনি মেয়েদের ইজ্জত দিয়ে কথা বলতে পারেন না,খুব খারাপ আপনি!
আহানা শান্তকে বকতে বকতে চলে গেলো ওখান থেকে
শান্ত মুখ ফুলিয়ে ঘাসের দিকে তাকাতেই ওর চোখ গেলো ঘাসের উপর থাকা নীল চুড়িটার দিকে
চুড়িটা ২ভাগ হয়ে পড়ে আছে,শান্ত ঘাসের উপর থেকে চুড়িটা হাতে নিয়ে দেখে পিছনে তাকালো আহানার দিকে আহানা হাত ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে,হাতে লাল লাল দাগ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শান্ত
এলিনা আসতেই শান্ত চুড়ি গুলো মুঠো করে ফেললো
তুমি এখানে কি করো,শশী ম্যাম ডাকতেসে তোমাকে সেই কখন থেকে!!চলো তো!
শান্ত চুড়িগুলো পকেটে ঢুকিয়ে ম্যামের কাছে গেলো
ম্যাম একেক করে সবাইকে টি-শার্ট দিচ্ছে এগুলা কাল সবার গায়ে থাকবে,কালো টি-শার্ট,মাঝখানে ভার্সিটির নাম লিখা
ম্যাম আহানাকেও ডাক দিলো
আহানা চোখ মুছে পিছনে তাকিয়ে বললো আসতেসি ম্যাম
চলবে♥

02/05/2026

#আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(০৪) ( scsalma90)

শ্বা*স ঝেঁ*ড়ে, নিজের মাথায় গা*ট্টা মে*রে মেঘ বলে, 'ছিঃ মেঘ ছিঃ, কি সব ভাবছিস তুই, কেউ কি তার চাচাতো ভাইয়ের উপর ক্রাশ খায়? ভালো, ভদ্র হলেও মানা যেতো, এমন গু*রুগ*ম্ভীর, ব*দমে*জা*জি আর হি*ট*লা*র স্বভাবের কেউ কি কারো ক্রা*শ হয়..!! যে ছেলে ১০ বছরের মেয়ের গা*য়ে হা*ত তু*লতে পারে সে আর যায় হোক আমার ক্রাশ হতে পারে না। এটা ভাবতেই মেঘের বু*ক ভে*সে আসে ক*ষ্টে।

নিজেকে স্বাভাবিক করতে মোবাইল হাতে নিয়ে কল করে মেঘের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী বন্যাকে। প্রথম কল দিতেই রিসিভ হয় কল..

বন্যা- আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো বেবি?

মেঘ- ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?

বন্যা- হঠাৎ আমায় স্বরণ করার কোনো স্পেশাল কারণ আছে? তোর তো আবার ভাঙা ফোন ঠাসঠুস বন্ধ হয়ে যাবে।

মেঘ রা*গান্বিত স্ব*রে একপ্রকার হুং*কার দিয়ে বলে... "তুই আজ কোচিং এ আসিস নি কেন? কি যে একটা জিনিস মিস করছিস..."

বন্যা- কি মিস করেছি বলে ফেলো বান্ধবী

মেঘ- এখন বললে কি আর সেই ফিল টা পাবি নাকি আজব

বন্যা- আরে বেবি বলো তুমি। কাল শুক্রবার কোচিং বন্ধ, আবার দেখা হবে রবিবারে ততদিন সহ্য হবে না। বলে ফেল প্লিজ।

মেঘ- আমার হাতে এখন iPhone 13 pro max

মেঘের কথা বন্যা এক বিন্দুও বিশ্বাস করে নি, হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলছে, এখন বল

'একটু পর 14 pro max কিনতে যাচ্ছিস,যাকে তার ভাই একটা আধা ভা*ঙা ফোন দিয়েছে ব্যবহারের জন্য, দিনে ১০০ বার বন্ধ হয়ে যায়, তার হাতে নাকি iPhone. তুই কি ঘুম থেকে স্বপ্ন দেখে উঠলি নাকি?'

মেঘের উৎফুল্ল মে*জাজ আচমকাই বি*গড়ে গেলো, অভিমানী স্বরে বললো,
'কাল আবির ভাই আসছেন বিদেশ থেকে ওনিই নিয়ে আসছেন আমার জন্য।'

বন্যা- তাই বল, নাহয় তোর যে ভাই সে তোকে এই জীবনে ফোন কিনে দিতো না, তোর বাবা দিতে চাইলেও সে আ*ছাড় মে*রে ভে*ঙে ফেলতো। ওয়েট ওয়েট, এই আবির ভাইটা কে রে? যে তোকে ছোট বেলা মে*রেছিল, সে?

মেঘ মুখ কালো করে উত্তর দিলো,
'হ্যাঁ আমার চাচাতো ভাই।'

বন্যা- তা তোর প্রতি এত মায়া হলো কিভাবে ওনার?

মেঘ- জানিনা। শুন তোকে কি বলি

বন্যা- হ্যাঁ বল

মেঘ- আসলে আজকে বিকালে আবির ভাইয়াকে দেখে ছোটখাটো একটা শ*ক খেয়েছি৷

বন্যা- মানে?

মেঘ- কি সুদ*র্শন চেহারা,দাঁড়ানোর স্টাইল,লুক আর অগোছালো চুলদেখে আমার মনটায় এলোমেলো হয়ে গেছে, আমি মনে হয় ওনার উপর ক্রাশ খেয়েছি.

মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে একটু ধাতস্থ হয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে বন্যা বললো,
'তোর মাথা ঠিক আছে মেঘ?তুই এতবছর যাবৎ বলছিস এই মানুষটা তোর শৈশব নষ্ট করে দিয়েছে, আজ কৈশোরে পা দিতেই এই মানুষটার উপর ক্রা-শ খেয়ে ফেলছিস? মানুষ রঙ বদলায়, কারণে অকারণে বদলায় কথাটা এতদিন শুনেছি কিন্তু আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে এই কথাটা ১০০% সত্যি। না হয় যাকে এত বছর শ*ত্রু ভেবে এসেছিস আজকে তার কথা অবলীলায় বলে যাচ্ছিস, বাহ মেঘ বাহ। '

মেঘের নিরবতা বুঝতে পেরে বন্যা আবার বলা শুরু করলো,
' এসব কোনো বিষয় না বেবি, হঠাৎ করে দেখেছিস তো তাই আহামরি সুদর্শন লেগেছে, বিষয়টা মাথা থেকে ঝে*ড়ে ফেল দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে, আমরা না দুজন দুজনকে কথা দিয়েছিলাম, একজন বিপথে গেলে আরেকজন সামলাবো । ভুলে গেলি?'

স্পষ্ট বুঝা গেলো মেঘের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি। সহসা নিজেকে সামলে আচমকা প্রশ্ন করে বসলো,

'আমি কি দেখতে সুন্দর না? আমি কি কারো ক্রাশ হওয়ার যোগ্য না?'

মেঘের আকস্মিক প্রশ্নে বন্যা কিছুটা হতভম্ব হলো এরপর
কয়েকমিনিট শুধু হেসেই গেলো.,স্বাভাবিক স্বরে বললো.. 'অবশ্যই তুই সুন্দর, ক্রাশ খাওয়ার ও যোগ্য কিন্তু তুই ছেলেদের ক্রাশ হতে পারবি কি না সন্দেহ আছে৷ হতে পারিস রাস্তাঘাটের,গাছগাছালির, রঙচটা দেয়ালের, গরুছাগলের ও হতে পারিস।'

রা*গে ফুঁ*সতে ফুঁ*সতে কল কেটে দিয়েছে মেঘ আর ভাবছে,
'আজকাল সান্ত্বনা নিতে চাইলেও মানুষ মজা নেয়'

যদিও বন্যার হাসির কারণ টা খুবই স্বাভাবিক । মেঘকে বরাবর ই চোখে চোখে রেখেছে তানভির সহ বাড়ির সকলে, 6-10 পর্যন্ত পড়েছে গার্লস স্কুলে, তারপর গার্লস কলেজ। আহারে জীবন ধূ ধূ মরুভূমির মতো কোথাও কেউ নেই। স্কুল কলেজের সামনেই বাসার গাড়ি থাকতো,বাসা টু স্কুল,স্কুল টু বাসা। কোনো ছেলে না দেখলে ক্রা*শ কিভাবে খাবে! বো*ধশক্তি হওয়ার পর মেঘ মনে হয় ২-৩ টা বিয়ে খেয়েছে কাজিনদের।৷ যাকে বলে নামের বিয়ে খাওয়া। তানভিরের ভয়ে বিয়ে বাড়ির এক কোণে বসে থাকতো মেঘ৷ ভাইয়ের ক*ড়া শাসন ছিল ঘর থেকে বের হতে পারবি না, বরযাত্রী আসলে তো আরও না। ঘরের ভিতরেই তারজন্য খাবার পাঠানো হতো, তানভির নিজেই বোনকে খাওয়াতো ইচ্ছে মতো। তারপর বিয়ে শেষ হলে মা বোনকে নিয়ে চলে আসতো। গায়ে হলুদে নাচা,গান গাওয়া এমনকি মেহেদীও দিতে পারে নি কখনো।। এই কষ্টে এখন আর মেঘ কারো বিয়েতেই যায় না। এতে তানভির মনে হয় হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।৷ মেঘের এই সাদাকালো জীবনের কথা শুনলে বন্যা কেনো পৃথিবীর সব মানুষ ই হাসবে। জীবনটা তার তেজপাতা হয়ে গেছে । মাঝে মাঝে ভাবে এই বাড়িতে জন্মানো টা কি খুব দরকার ছিল...!!!

কয়েকবার বন্যা কল ব্যাক করেছে, নিজের জীবনের হতাশার জন্য মেঘ আর কল রিসিভ ই করে নি, বান্ধবীকে রাগ দেখিয়ে কি হবে...! জীবন যেখানে যেমন তা মানতেই হবে।

মেঘের বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে বন্যাকেও। মেঘের সাথে সাথে বন্যাকেও চোখে চোখে রাখে তানভির। কথায় আছে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে, সঙ্গ খারাপ হলে মেঘও খারাপ হবে তাই সব সময় বন্যার পিছনে লোক লাগিয়ে রাখে। শুধু বন্যাই না আরও ২ জন বান্ধবী আছে মেঘের, একজন পাখি আরেকজন মায়া। ওদেরকেও নজরে রাখে তানভির। বোনকে সব দিক থেকে প্র*টেক্ট করাই যেন তার প্রথম এবং প্রধান কাজ৷

পেইজঃ Salma Chowdhury - সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★

আবির বিকাল থেকে ঘুমাচ্ছে। সন্ধ্যা ৭ টায় ঘুম ভাঙে আদির ডাকে। নিচে আবিরের আব্বু আর মেঘের আব্বু বসে আছেন, আবিরের বাইক কেনার কথা শুনেই তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন অফিস থেকে৷ আবির ঘুম থেকে উঠে চোখেমুখে পানি দিয়ে টাওয়েল দিয়ে কোনোরকমে মুখ টা মুছে তৎক্ষনাৎ রুম থেকে বের হয় ৷ সে তার বাবাকে খুব ভালো করে চিনে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত না হলে বাড়িতে তা*ন্ডব শুরু করে দিবেন। আবিরের চোখে মুখে ঘুমের প্রভাব স্পষ্ট । ব্যস্তপায়ে হাঁটছে সে, আচমকা এলেমেলো পায়ে ছুটে রুম থেকে বের হয় মেঘ চুলগুলো অগোছালো। আকস্মিক ধা*ক্কা এড়াতে চটজলদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে অ*গ্নিদৃ*ষ্টিতে তাকায় আবির, তৎক্ষনাৎ মোটা ভ্রু*যূগল শিথিল হয়ে যায়,অ*মত্ত চেয়ে রইলো সে

একমুহূর্তের জন্য মস্তিষ্ক থমকে গেছে আবিরের, দৃষ্টি তার প্র*খর, আচ*মকা হাঁটা থামাতে শ্বাস ভা*রি হয় আবিরের, কালো জামা প*রিহিতা এক ললনার দিকে দৃষ্টি পরে, আ*পাদমস্তক দেখলো একবার, কালো জামাতে যাকে অ*প্সরার ন্যায় লাগছে, এলোমেলো চুলগুলো তার কোমড় ছাড়িয়েছে চুল দেখে মনে হয় জীবনানন্দ দাশের বনলতাকে উদ্দেশ্য করে লেখা,

"চুল তার কবেকার অন্ধ*কার বিদিশার নিশা।"

দ্রুতগতি থামাতে গিয়ে মেঘের ছোট দেহ কম্পিত হয়,দৃষ্টি পরে ৬ ফুট লম্বা মানুষটার বু*কে, মেঘ মুখ তুলে তাকায় সেই মানুষটার চেহারার পানে, আবিরের চোখের দিকে বি*স্ময়াভিভূত নয়নে তাকিয়ে আছে মেঘ, পলক ও পরছে না একটিবার, আবিরের চোখে মুখে ছিটানো পানির ঝাপটায় এলোমেলো চুলগুলো থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরছে যা তার পরনের সাদা টিশার্ট অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই আবিরের,

আবির কয়েক সেকেন্ড স্ত*ব্ধ থেকে হঠাৎ চোখ সরিয়ে পুনরায় রু*দ্রমূর্তি ধারণ করে স*বেগে হাঁ*টা দেয় সিঁড়ির দিকে, পিছন থেকে অষ্টাদশীর কোমল কন্ঠে ডাক শুনে থমকে দাঁড়ায় আবির তবে পিছনে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে নি সে,

মেঘ ভ*য়ার্ত কন্ঠে বলে, 'Thank you Abir Vai'

আবির শুনলো কি না কে জানে, এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে যথারীতি ব্য*স্ত ভঙ্গিতে নিচে নেমে যায়।

মেঘ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে,থরথর করে কাঁপছে মেঘের হাত পা, মেঘের মনে হচ্ছে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে সমগ্র পৃথিবী। কেনো জানি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাড়াতাড়ি দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে। এতগুলো বছর পর আবিরের চোখে চোখ রাখলো মেঘ, ভেতর টা ভ*য়ে আঁ*তকে উঠছে বার বার, অন্তরা*ত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে মেঘের৷
পেইজঃ Salma Chowdhury - সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★

সোফায় বসে আছেন ২ ভাই,বাড়ির মহিলা রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকলেও নজর তাদের এদিকে, কি হবে কে জানে

আলী আহমদ খান নিজের গা*ম্ভীর্যতা বজার রেখে একপ্রকার হুংকার দিয়ে প্রশ্ন করলেন,
"তুমি নাকি বাইক কিনেছো?"

এই কথায় হুঁশ ফিরে অষ্টাদশীর, কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ২ পা সামনে এগিয়ে বারান্দার সাইডে দাঁড়িয়ে নিচে তাকায় মেঘ, নিচে সোফায় বসা আব্বু আর বড় আব্বু, তাদের থেকে কিছুটা দূরে দুহাত ভাজ করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির৷

জ্বী', ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দেয় আবির।

'কিন্তু কেন?' পুনরায় হুংকার দেন তার আব্বু।

'আমার বাইক কেনার ইচ্ছে ছিল তাই কিনেছি,'

'তুমি জানো না এই বাড়িতে বাইক কেনা বা চালানো নিষেধ?' এবার প্রশ্ন টা চাচ্চু মোজাম্মেল খান করেছেন।

'হ্যাঁ জানি, ২০/৩০ বছর আগে কি ঘটে গেছে তা নিয়ে আতঙ্কে থাকার কোনো মানে হয় না, যদি কপালে খারাপ কিছু লিখা থাকে তাহলে সেটা ৭ সমুদ্র পারি দিয়ে হলেও আসবেই। সেটা আমি ঘরে বসে থাকলেও হবে আর গাড়িতে চলাচল করলেও হবে৷ '

'তোমরা ২ ভাই কি নিজেদের মর্জি মতোই চলবে?' আলী আকবর খান রা*গান্বিত স্বরে প্রশ্ন করলেন।

'বাইক কিনা যদি নিজের ইচ্ছে মতো চলা হয় তাহলে আমি দুঃখিত আব্বু৷ এই ব্যাপারে আমি নিজের মনের কথায় শুনবো।'

'আমাদের নিজস্ব ৩ টা গাড়ি আছে, এত গাড়ি কেনো কিনলাম তোমাদের জন্যই তো' মোজাম্মেল খান কোমল স্বরে বললেন।

'গাড়িতে চলাচল আপনাদের ইচ্ছে তাই আপনারা গাড়ি কিনেছেন, আমার গাড়িতে চলাচল করতে ভালো লাগে না তাই আমি বাইক কিনেছি এটা নিয়ে এত কথা বাড়ানোর কি আছে চাচ্চু । তোমাদের বাইক সম্পর্কিত জে*রা শেষ হলে আমার তোমাদের কে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা আছে। ' আবির আব্বুর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো।

এতক্ষণ বাড়ির মহিলা রান্নাঘরে থাকলেও এবার আর থাকতে পারলেন না, এক ছুটে সবাই ড্রয়িংরুমে চলে এসেছেন । মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। এই বাড়িতে এত বছরে কাউকে গলা উঁচু করে মুখের উপর কথা বলতে শুনেনি সে। তানভির ভাইয়া যত মেজাজ দেখিয়েছে সব মেঘের উপর, বড় আব্বু বা নিজের আব্বুর মুখের উপর কথা বলার সাহস হয় নি তার। আবির ভাই ২দিন হলো এসছে,আজই বাবার মুখের উপর নিজের ম*র্জি শুনাচ্ছে, এখন মেঘের মনে হচ্ছে ওনি হি*ট*লা*রের থেকেও বড়মাপের কিছু । মনোযোগ দিয়ে বাকি কথা শুনার চেষ্টা করছে মেঘ.

আবির: আব্বু,চাচ্চু আমি অনেকদিন যাবৎ চিন্তা ভাবনা করেছি নিজে একটা কোম্পানি শুরু করার। তোমরা অনুমতি দিলে কাজ শুরু করবো

মোজাম্মেল খান ও আলী আকবর খান দুজনের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পরেছে। এতবছর ছেলেকে বাহিরে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন, দেশে এসে নিজের ব্য*বসার হাল ধরবে, দেশে পা দিতেই নিজে কোম্পানি খোলার চিন্তা ভাবনা করছে ছেলে৷

মোজাম্মেল খান চিন্তিত কন্ঠে বললেন, আমরা তো ভেবেছিলাম তুমি পারিবারিক ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আবির কিছু বলার আগেই আলী আকবর খান বলে উঠলেন,
'ঠিক আছে, তুমি পড়াশোনা করে এসেছো, তোমার নিজস্ব মতামতের গুরুত্ব আমরা অবশ্যই দিবো,তোমার নতুন কোম্পানি নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই তবে আমার একটা শর্ত আছে, তুমি আমাদের কোম্পানির CEO হবে, আগামীকাল শুক্রবার অফিস ছুটি তাই তুমি শনিবারে অফিসে যাবে,তোমাকে অফিসিয়াললি CEO পদ দেওয়া হবে। তারপর তুমি আমাদের অফিস সামলে যদি নতুন কোম্পানি শুরু করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারো তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। Best of luck my boy.

আবির যেনো আগে থেকেই জানতো এরকম কিছু হবে তাই তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না'

এতটুকু বলে সোফা থেকে উঠে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলেন আবিরের আব্বু, কয়েক কদম এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে রু*দ্ধ কন্ঠে বললেন,

'আমরা কোম্পানি সামলানোর জন্য সারাজীবন থাকবো না তোমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে, তুমি না পারলে তোমার প্রাণপ্রিয় ভাই তানভিরকে বলো রা*জ*নী*তি ছেড়ে ব্যবসায় আসতে তারপর তুমি তোমার মতো নিজে কোম্পানি খুলতে থাকো।'

আবির চোয়াল শক্ত করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

'তানভির রা*জনী*তিই করবে ওর মাথায় ব্যবসা ঢুকানোর কোনো দরকার নেই, শনিবারেই অফিসে আসবো আমি। আমি একায় সবদিক সামলাতে পারবো। তোমরা দয়া করে তানভিরকে মুক্তি দাও, নিজের মতো করে রাজনীতি টা করতে দাও ওকে। তোমার শ*র্ত যেমন আমি মেনে নিয়েছি তোমাদেরকেও আমার একটা শর্ত মানতে হবে সেটা হলো, আমি আমার মন মতো কাজ করবো, আমার যখন যেখানে প্রয়োজন হবে নিজের কাজ গুছিয়ে আমি চলে যাব তখন আমাকে কোনো প্রকার বাঁ*ধা দিতে পারবে না কেউ। দরকার হলে ২ অফিসের কাজ শেষ করে আমি রাত ১২ টায় বা ২ টায় বাসায় ফিরবো এমনকি নাও ফিরতে পারি এতে তোমাদের যেনো মা*থা*ব্যথা না হয়।'

একদমে কথাগুলো বলে কোনোদিকে না তাকিয়ে দ্রুতপায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আবির

আলী আহমদ খান কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে রুমের দিকে হাঁটা দেন।

পিনপতন নীরবতা বাড়িতে৷ সোফায় বসে আছেন মোজাম্মেল খান, কাছেই তিন ঝা একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে বারবার, তাদের আবিরের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাহিরের দুনিয়া সামলাতে গিয়ে নিজের প্রতি না যত্নহীন হয়ে পরে ছেলেটা এটায় তাদের চিন্তার বিষয়।

নিচে উপস্থিত মানুষগুলোর মধ্যে চিন্তার ছাপ দেখা গেলেও উপরে দাঁড়িয়ে একপ্রকার বিনোদন উপভোগ করছিল মেঘ৷ যেই বড় আব্বুর কথার উপর কারো কথা চলে না আজ ওনার সাথে টক্কর দেয়ার মানুষ এসেছে৷ বাবা ছেলে কি শ*র্তটায় না দিচ্ছে৷ যেমন বাবা তেমন ছেলে এসব ভেবেই হাসি পাচ্ছে মেঘের। হঠাৎ করেই হাসিটা গা*য়েব হয়ে মুখটা ভা*রি হয়ে গেলো মেয়েটার, আর ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করলো,
" নিজে তো হি*ট*লা*র সাথে আমার ভাইটাকে বড় গু*ন্ডা বানাতে কি সুন্দর উৎসাহ দিচ্ছে । এতবছর ভাইয়ের জ্বা*লায় জীবন তেজপাতা এখন আবার আরেকজনের আবির্ভাব হলো। কপালটায় খারাপ আমার। "

এখন নিচে যাওয়ার পরিস্থিতি নেই তাই বিড়বিড় করতে করতে রুমে ঢুকতে যাবে হঠাৎ চোখ পরে আবির ভাইয়ার রুমের দিকে এক রাশ হতাশা নিয়ে রুমে ঢুকে যায় মেঘ।

বাবা মা কে ছেড়ে আলাদা রুমে থাকলে খুব স্বাধীনতা পাবে ভেবে নিচতলা থেকে উপর তলায় চলে এসেছিল মেঘ, আবির ভাই বিদেশ যাওয়াতে কোনো চিন্তায় ছিল না। কিন্তু মেঘ আসার ১৫ দিনের মাথায় তানভির ও মেঘের পাশের রুমে চলে আসে জিনিসপত্র নিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠতেই তানভিরের রুম। বোনকে পাহারা দিতেই মূলত এই রুমে আসা। তানভির যতক্ষণ রুমে থাকে ততক্ষণ নিজের রুমের দরজা টা খুলে রাখে, মেঘ সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠতে গেলেও ভাইয়ের কথা ভেবে আস্তেধীরে উঠানামা করে৷ বর্তমানে মেঘের অবস্থা না*জে*হাল কারণ তার একপাশে আবির ভাই এর রুম,আরেকপাশে তানভির ভাইয়ের৷ তানভির ভাইয়ের পরের রুমটা মীমের জন্য ঠিকঠাক করা হচ্ছে কিছুদিন পর থেকে মীমও উপরে থাকবে কিন্তু তাতে কি! ভাইয়ের ঘর ডিঙিয়ে মীমের রুম পর্যন্ত যেতে পারবে কি না স*ন্দেহ আছে৷
পেইজঃ Salma Chowdhury - সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★

রাত ১০ টার উপরে বাজে সবাই খাওয়াদাওয়া শেষ করে যার যার রুমে চলে গেছে। আবির এখনও বাড়ি ফিরে নি। মালিহা খান সোফায় বসে অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য । ১০-১৫ মিনিট পর বাড়িতে ঢুকলেন আবির আর তানভির, মাকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা রা*গান্বিত হলো ছেলে।

'আম্মু তুমি আমার জন্য এভাবে রাত জেগে বসে থেকো না প্লিজ, আমি নিজের মতো করে খেয়ে নিবো।'

'তোর বউ আসলে আমি আর অপেক্ষা করবো না তোর জন্য,' সহসা উত্তর দিলেন মালিহা খান।

বড় আম্মুর কথা শুনে স্ব শব্দে হেসে উঠে তানভির । আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তানভিরের দিকে সঙ্গে সঙ্গে তানভির হাসি থামিয়ে ফেলে, নিঃশব্দে হাসছে সে।

তানভির বরাবর ই ভী*তু প্রকৃতির, বাহিরে যতই শ*ক্তপো*ক্ত থাকুক না কেন বাবা, চাচা আর ভাইয়ের সামনে সে যেনো ভে*জা বিড়াল। এতদিন যত কাজ ই থাকতো ছেলেটা ৮-৯ টার মধ্যে বাড়ি এসে সবার সাথে খেতে বসতো৷ কিন্তু আবির ফেরাতে টাইম সিডিউলে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে ছেলেটার।

চলবে......

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address

Dhaka