Warisa Rifat
14/07/2026
একটা সমান্তরাল রেললাইনের মতো আমাদের জীবনটাও দুটো চেনা ট্র্যাকে ছুটে চলে,
কখনো আনন্দ, কখনো স্তব্ধতা।
দুই ধারের চেনা স্টেশনগুলো আসে, চেনা মানুষগুলো ওঠে আর চেনা মুখগুলো আবার ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায়।
এই অনন্ত যাত্রার কোনো শেষ নেই, শুধু জানালার বাইরে দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসটাই আমাদের ক্লান্ত শরীরকে ছুঁয়ে দিয়ে যায়।
— Warisa Rifat
09/07/2026
এক বুক বোঝাই কথা নিয়ে আমি হেঁটে চলি,
অথচ চারপাশের কোলাহলে আমার কোনো শ্রোতা নেই।
অবিক্রীত রয়ে যাওয়া চৈত্রমাসের রোদের মতো,
আমার এই না-বলা কথাগুলো বুকের ভেতর প্রতিদিন তীব্রভাবে পুড়তে থাকে।
— Warisa Rifat
07/07/2026
কখনো কি খেয়াল করেছেন, ফোনের গ্যালারির চেয়েও বেশি গল্প লুকিয়ে থাকে আমাদের ফোনের 'ডিলিট' বা 'ট্র্যাশ' ফোল্ডারটাতে?
সেদিন ফোনের মেমোরি ফুল হয়ে যাওয়ায় পুরনো কিছু ছবি ডিলিট করতে গিয়েছিলাম। সেখানে জমা হয়ে আছে কত শত পারফেক্ট হতে না পারা ছবি! কোনো ছবিতে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে, কোনোটা ঝাপসা এসেছে, আবার কোনোটাতে হয়তো হাসির ভঙ্গিটা ঠিকঠাক হয়নি। আমরা স্ক্রিন স্ক্রোল করে শুধু সুন্দর ছবিটাই গ্যালারিতে রাখি, আর বাকি সব ডিলিট করে দিই।
তখন বসে বসে ভাবছিলাম, আমাদের জীবনটাও কি ঠিক এই ফোনের গ্যালারির মতোই নয়? আমরা সবসময় মানুষের সামনে আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, হাসিখুশি আর পারফেক্ট অংশটুকুই দেখাই। অথচ পেছনের যে কত শত ভুল, কত ভাঙাগড়া আর মন খারাপের মুহূর্ত ডিলিট ফোল্ডারের মতো আড়ালে পড়ে থাকে, তা কেউ জানতেও পারে না।
কিন্তু সত্যি বলতে, ওই পারফেক্ট ছবিটার চেয়েও ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবিগুলোর পেছনেই আসল হাসির গল্পটা লুকিয়ে থাকে। প্রতিটি ভুল আর খুঁত মিলেই তো আমরা একেকটা আস্ত মানুষ, তাই না? জীবনের সবকিছু পারফেক্ট না হলেও চলে।
— Warisa Rifat
06/07/2026
টেবিলের ওপর রাখা আমার সাধের ফোনটার স্ক্রিনটা যখনই জ্বলে ওঠে, আমার হুট করে অনেক বছর আগের এক বিকেলের কথা মনে পড়ে যায়।
তখন আমি বেশ ছোট। পাড়ার এক বড় ভাইয়ের হাতে প্রথম একটা বাটন মোবাইল দেখেছিলাম। কী অদ্ভুত এক ঘোর লাগা অনুভূতি ছিল তখন! চারকোনা একটা ছোট্ট স্ক্রিন, আর তাতে ভেসে উঠছে আলো। তখন ভাবতাম, এই ছোট্ট প্লাস্টিকের বাক্সটার ভেতর মানুষ থাকে কীভাবে? দূর থেকে অন্য মানুষের গলা ভেসে আসে কীভাবে? প্রযুক্তি নিয়ে সেই যে একটা বিস্ময় বুকের ভেতর তৈরি হয়েছিল, তা আজও কাটেনি।
আজ যখন ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাই কিংবা নতুন কোনো গ্যাজেট হাতে নিই, আমার সেই ছোটবেলার অবাক হওয়া চোখ দুটোর কথা মনে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের চারপাশের প্রযুক্তি কত বদলে গেছে, তাই না? বাটন ফোন থেকে স্মার্টফোন, তারযুক্ত ইয়ারফোন থেকে তারহীন ইয়ারবাডস, সবকিছুই কত সহজ আর দ্রুত হয়ে গেছে।
কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাবি, এই গ্যাজেটগুলো কি আমাদের শুধু কাজই সহজ করছে, নাকি আমাদের জীবনের গল্পগুলোকেও বদলে দিচ্ছে? এই যেমন এখন আমি ঢাকার এক কোণে বসে টাইপ করছি, আর স্ক্রিনের ওপাশে থাকা আপনারা অন্য কোনো প্রান্ত থেকে এই লেখাটা পড়ছেন। এই যে আপনাদের সাথে আমার সংযোগ, এটাও তো এই প্রযুক্তিরই এক অদ্ভুত ম্যাজিক!
প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় প্রতিদিন কত নতুন নতুন গ্যাজেট আসছে। কোনটা আমাদের আসলেই কাজে লাগছে, আর কোনটা শুধুই লোকদেখানো বোঝা মুশকিল!
আপনার জীবনের প্রথম মোবাইল ফোন কোনটা ছিল? সেই ফোনটা হাতে পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? চলুন আজ একটু অতীতে ফিরে যাওয়া যাক!
— Warisa Rifat
আমার বয়স যখন নয়, তখন বুঝতাম না ডিভোর্স মানে কী। শুধু বুঝতাম রাতে আব্বু আর আম্মু একই ঘরে ঘুমায় না। আব্বু বাইরের ঘরে থাকেন, আম্মু ভেতরে। আর দুজনের মাঝখানে একটা দরজা। সেই দরজাটা কখনো কেউ খোলে না।
আমি মাঝরাতে উঠে সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কোন ঘরে যাব বুঝতাম না। সেটাই ছিল আমার শৈশব। দুই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাচ্চা।
আব্বু আম্মুর ঝগড়া নতুন ছিল না। যতদূর মনে পড়ে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। কিন্তু একটা সময় ঝগড়াও বন্ধ হয়ে গেল। ঝগড়া বন্ধ হওয়া মানে শান্তি না। ঝগড়া বন্ধ হওয়া মানে দুইজন দুইজনকে এতটাই ছেড়ে দিয়েছেন যে কথা বলার ইচ্ছেটুকুও নেই। নীরবতা ঝগড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। এটা বড় হয়ে বুঝেছি।
যেদিন কাগজে সই হলো সেদিন আমি স্কুলে ছিলাম। কেউ বলেনি। বাড়ি ফিরে দেখি আব্বুর জামাকাপড়ের আলমারিটা খালি। শুধু একটা আতরের শিশি পড়ে আছে। আব্বুর গায়ে সবসময় এই আতর থাকত।
আমি সেই শিশিটা তুলে বুকে ধরে বসে রইলাম।
আম্মু ঘরে এলেন। আমার মাথায় হাত দিলেন। কিন্তু কিছুই বললেন না। আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
কিছু কথা আছে যেগুলো না জানলেই ভালো থাকা যায়।
এরপর থেকে আমার জীবন দুই ভাগ হয়ে গেল। সোম বুধ শুক্র আব্বুর কাছে। বাকি দিন আম্মুর কাছে। ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখতাম কোনদিন কার কাছে যাব। একটা বাচ্চার কাছে ক্যালেন্ডার থাকে ছুটির দিন গোনার জন্য। আমার কাছে ছিল বাবা আর মায়ের মাঝে ভাগ হওয়ার হিসাব রাখার জন্য।
ঈদের দিনটা সবচেয়ে কঠিন ছিল। সবাই পরিবার নিয়ে বসে আছে, আর আমি ভাবছি এখন কার বাড়িতে যাব। আব্বুর বাড়িতে গেলে আম্মু অপেক্ষায় থাকবে। আম্মুর কাছে গেলে আব্বু অপেক্ষায় থাকবে। একটা বাচ্চার পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না। কিন্তু নিতে হতো।
বড় হতে হতে একটা জিনিস শিখে গেলাম। কোনো কষ্টের কথা কাউকে বলা যাবে না। আব্বুর কাছে আম্মুর কথা না। আম্মুর কাছে আব্বুর কথা না। দুইজনের মাঝখানে আমি একটা দেয়াল। দুই দিকের কষ্ট আমার ভেতরে জমা হয়, কিন্তু বের করার জায়গা নেই। সেই বয়স থেকেই আমি চুপ থাকতে শিখে গেছি।
একবার ক্লাসে রচনা লিখতে দিয়েছিল, আমার পরিবার। সবাই লিখছে আব্বু আম্মু ভাই বোন সবাই মিলে সুখে আছি। আমি খাতার সামনে বসে থাকলাম। কী লিখব বুঝলাম না। শেষমেশ লিখলাম, আমার পরিবার অনেক ভালো। মিথ্যা লিখলাম। কিন্তু সত্যিটা লেখার ভাষা আমার জানা ছিল না।
আব্বু আম্মু দুইজনেই আমাকে ভালোবাসতেন। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দুইজনের ভালোবাসার মাঝখানে আমি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলাম। কারণ তাঁরা আমাকে ভালোবাসলেও একে অপরকে সহ্য করতে পারতেন না। আর সেই না পারাটার মাঝখানে আমি ছিলাম।
একটা বাচ্চা যখন দেখে তার মা কাঁদছে, সে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। আমিও ধরতাম। আম্মু চোখ মুছে বলতেন, কিছু না মা। চোখে কী যেন পড়েছে।
আমি জানতাম চোখে কিছু পড়েনি। কিন্তু আম্মুর মিথ্যাটাকে সত্যি বলে মেনে নিতাম। কারণ এটুকুতেই তিনি শান্তি পেতেন।
বছর পাঁচেক পর আব্বু আবার বিয়ে করলেন। নতুন আন্টি ভালো মানুষ। কিন্তু সেই বাড়িতে গেলে আমার কেমন লাগত জানেন? মনে হতো আমি অতিথি। নিজের বাবার বাড়িতে অতিথি। ওই ঘরের সব কিছু নতুন। নতুন পর্দা, নতুন সোফা, নতুন মানুষ। শুধু আব্বুটা পুরনো। কিন্তু আব্বুকেও কেমন পুরনো লাগত না আর।
আম্মু আর বিয়ে করেননি। জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন। বলেছিলেন, তুই আছিস, আর কী লাগবে।
সেই কথাটা শুনে কান্না পেয়েছিল। কিন্তু কাঁদিনি। কারণ আম্মুর সামনে কাঁদলে আম্মু ভাববেন আমি কষ্টে আছি। আম্মু সারাজীবন নিজের কষ্ট চেপে রেখেছেন আমার জন্য। আমিও তাঁর জন্য সেটাই করব।
মা মেয়ে দুইজনেই চুপ থেকে একে অপরকে আগলে রেখেছিলাম।
এখন আমার বয়স চব্বিশ। বিয়ের কথা উঠলেই বুকের ভেতরে একটা ভয় কাজ করে। সেই ভয়টার নাম আমি অনেকদিন ধরতে পারতাম না। পরে বুঝলাম, আমি ভয় পাই সেই দরজাটাকে। যে দরজাটা দুই ঘরের মাঝখানে বন্ধ থাকত। যে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রতি রাতে বুঝতাম না কোন দিকে যাব।
বাবা মায়ের ডিভোর্স সন্তানের জীবন শেষ করে দেয় কি না জানিনা। কিন্তু একটা জায়গায় আঘাত করে যেটা কখনো পুরোপুরি সেরে উঠে না। আর সেটা হলো নিরাপত্তার জায়গাটা। পরিবার মানে নিরাপদ থাকা। পরিবার মানে ফিরে আসার একটা জায়গা। কিন্তু যে বাচ্চার পরিবারটাই দুই ভাগ হয়ে যায়, সে কোথায় ফেরে?
আমি আজও জানি না। শুধু জানি আতরের সেই শিশিটা আমি এখনো রেখে দিয়েছি। অনেক বছর পুরনো। আতর শেষ হয়ে গেছে কবেই। কিন্তু শিশিটা খুললে এখনো একটু গন্ধ পাই।
আব্বুর গন্ধ।
সেটুকুই আমার কাছে পরিবারের স্মৃতি।
✍️ Warisa Rifat
Click here to claim your Sponsored Listing.